ট্রাম্পের নজর কাড়ল মিসিসিপির শিক্ষাবিপ্লব, পিছিয়ে থাকা রাজ্য এখন পড়াশোনায় নবম স্থানে
একসময় পিছিয়ে থাকা মিসিসিপির শিক্ষার্থীরা জাতীয় পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে সব শ্রেণিতে শীর্ষস্থান অর্জনের দাবি পুরোপুরি সত্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে করা প্রশংসামূলক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, একসময় দেশের শিক্ষার মানের বিচারে পিছিয়ে থাকা মিসিসিপি এখন অন্যতম ভালো ফল করা অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষামূল্যায়নের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বক্তব্যের পেছনে বাস্তব অগ্রগতির যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে দেশের সেরাদের কাতারে তুলে দেওয়ার দাবি যাচাই করতে হলে বিভিন্ন শ্রেণি, বিষয় ও মূল্যায়নপদ্ধতির ফল আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মিসিসিপির শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা ও গণিতের ফলাফলে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শিক্ষাগত অগ্রগতি মূল্যায়নের ২০২৪ সালের ফল অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পড়ার পরীক্ষায় মিসিসিপির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অবস্থান ছিল অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ৪৯তম। ২০২৪ সালে সেই অবস্থান উন্নীত হয়ে নবম স্থানে পৌঁছায়। একই সময়ে গণিতের পরীক্ষায় তাদের অবস্থান ৫০তম থেকে ১৬তম হয়েছে। অর্থাৎ, দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এক দশকের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
এই সাফল্য কেবল অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসিসিপির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতার নির্ধারিত মান অর্জনের হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ শতাংশ হয়েছে। গণিতে একই হার ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপরীতে, একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে পড়ার দক্ষতার নির্ধারিত মান অর্জনের হার ৩৪ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশ হয়েছে এবং গণিতে ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৩৯ শতাংশে নেমেছে। এই তুলনা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির ক্ষেত্রে মিসিসিপি জাতীয় প্রবণতার তুলনায় ভালো করেছে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে মিসিসিপির সব শিক্ষার্থী দেশের অন্য সব অঙ্গরাজ্যের শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের পরীক্ষায় চতুর্থ শ্রেণির পড়ার ফলাফলে নবম স্থান এবং গণিতে ১৬তম স্থান অর্জন করলেও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিচে ছিল। পড়ায় তারা ৪১তম এবং গণিতে ৩৫তম স্থানে ছিল। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে অর্জিত সাফল্যকে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সমান সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ হবে না।
অগ্রগতির পেছনে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মিসিসিপি ২০১৩ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। দুর্বল ফল করা বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের সহায়তা, পড়ার সমস্যায় থাকা শিশুদের শনাক্তকরণ এবং নির্দিষ্ট শিক্ষণপদ্ধতির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৃতীয় শ্রেণি শেষে পড়ার দক্ষতা যাচাই এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও এই নীতির অংশ। শিক্ষা বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসব উদ্যোগকে রাজ্যটির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মিসিসিপির এই অগ্রগতি বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণেও দেখা যায়। ২০২৪ সালের জাতীয় মূল্যায়নে রাজ্যটির অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়ার ফলাফলে নিজ নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়ভাবে প্রথম এবং গণিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। হিস্পানিক শিক্ষার্থীদের পড়ায় প্রথম ও গণিতে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়া ও গণিত—উভয় বিষয়েই অবস্থান ছিল তৃতীয়। এসব ফল ইঙ্গিত দেয়, উন্নতির সুফল কেবল একটি সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তারপরও শিক্ষার মান নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জাতীয় পরীক্ষায় কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা বিষয়ে ভালো অবস্থান অর্জন করা এবং সব শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মিসিসিপির চতুর্থ শ্রেণির মাত্র ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ায় এবং ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে নির্ধারিত দক্ষতার মান বা তার বেশি অর্জন করেছিল। অর্থাৎ, অগ্রগতি সত্ত্বেও যথাক্রমে প্রায় ৬৮ ও ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী সেই নির্দিষ্ট মানে পৌঁছাতে পারেনি। তাই উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্যেও শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতির ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মিসিসিপির শিক্ষা বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শিশুদের শিক্ষাবিষয়ক জাতীয় মূল্যায়নভিত্তিক তালিকায় রাজ্যটি শিক্ষাক্ষেত্রে ১৬তম অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের রাজ্যভিত্তিক বিদ্যালয় মূল্যায়নের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায়, ১৩৮টি প্রচলিত সরকারি বিদ্যালয় জেলার মধ্যে ১২১টি জেলা সি বা তার চেয়ে ভালো শ্রেণি পেয়েছে। এটি মোট জেলার প্রায় ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মূল্যায়নের মানদণ্ড আরও কঠোর করা হয়েছিল বলে আগের বছরের শ্রেণিভিত্তিক ফলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
সুতরাং, ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল দাবিটি আংশিকভাবে সত্য বলে বিবেচিত হতে পারে। মিসিসিপি এক দশকের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের পড়া ও গণিতের জাতীয় মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু রাজ্যটির সব বিদ্যালয়, সব শ্রেণি ও সব বিষয়ে দেশের সেরাদের কাতারে উঠে গেছে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই। জাতীয় মূল্যায়নের নির্দিষ্ট ফলাফল এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
মিসিসিপির অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ার দক্ষতার ওপর জোর এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তা শিক্ষার ফল উন্নত করতে পারে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে অষ্টম শ্রেণিসহ পরবর্তী শিক্ষাস্তরেও অগ্রগতি বাড়ানো, দুর্বল বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সমাধান এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ট্রাম্পের প্রশংসা তাই বাস্তব অগ্রগতির একটি দিক তুলে ধরলেও পুরো চিত্র বুঝতে সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন শ্রেণির ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।