বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, টোকিওতে বৈঠকে তারেক রহমান ও তাকাইচ
টোকিওতে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ঘিরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দুই দেশের।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্যে জাপান সফর করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার দিনের সরকারি সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি কার্যালয় কান্তেইতে এই বৈঠক আয়োজনের কথা জানিয়েছে দুই দেশের সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সূত্র। তবে বৈঠক শেষ হওয়ার পর তার ফলাফল, যৌথ ঘোষণা কিংবা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া না গেলে সেগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। সফরটির অন্যতম উদ্দেশ্য দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। জাপানের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতেও দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজের কর্মসূচির উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানোর এবং তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। এরপর সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে দুই নেতার বৈঠক শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ ঘোষণা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে মধ্যাহ্নভোজের কর্মসূচিও নির্ধারিত ছিল। তবে এসব সময়সূচি আগে প্রকাশিত কর্মসূচির ভিত্তিতে উল্লেখ করা হচ্ছে; আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা যাচ্ছে না।
বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে রয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বাংলাদেশের জন্য জাপান দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। দেশের যোগাযোগব্যবস্থা, নগর পরিবহন, জ্বালানি এবং শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়নে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় চলমান সহযোগিতা আরও কার্যকর করা এবং নতুন প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেতে পারে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, বাংলাদেশি পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনার কথা আগেই জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য জাপানের বাজার ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে চুক্তির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, ব্যবসায়িক প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের ওপর।
কৃষি, মৎস্য, দক্ষতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ, বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এর আগে জানিয়েছিলেন, সফরকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল; এর মধ্যে তিন থেকে চারটি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে আলোচনা চলা, স্বাক্ষরের পরিকল্পনা এবং চূড়ান্তভাবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট চুক্তিকে স্বাক্ষরিত বলে উল্লেখ করা সমীচীন হবে না।
জ্বালানি ও শিল্প খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং আধুনিক উৎপাদনশিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। সফরের কর্মসূচিতে জাপানের শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শনের কথাও রয়েছে। এসব যোগাযোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনও আলোচনায় এসেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২২ অক্টোবর জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেইয়ের বরাতে জানায়, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ আনুমানিক ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে গাড়ি উৎপাদন, অন্যান্য শিল্প এবং জ্বালানি অবকাঠামোর কথা বলা হয়। তবে রয়টার্স জানিয়েছিল, তারা ওই প্রতিবেদনটি স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই এ অর্থকে নিশ্চিত বিনিয়োগ চুক্তি বা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আসা অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
বাংলাদেশের পক্ষে এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো জাপানি ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। সফরসূচিতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা এবং বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও আলোচনায় স্থান পাওয়ার কথা। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব বিষয়ে বৈঠকে ঠিক কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জানতে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রয়োজন।
তারেক রহমানের জাপান সফরকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য মূল্যায়নের জন্য বৈঠকের আনুষ্ঠানিক ফলাফল, স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ এবং ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।