ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে ২০টি দলের অভিযান, অনিয়মে জরিমানা ও সরকারি বাসা বাতিলের নির্দেশ
৫,২৩৮ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
ঢাকা মহানগরীকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করে তুলতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ২০টি বিশেষ পরিবীক্ষণ দলের মাধ্যমে তদারকি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, বিভিন্ন স্থাপনা ও আশপাশের পরিবেশে অপরিচ্ছন্নতা এবং এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সরকারি বাসার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাতিলের কথাও জানিয়েছেন তিনি। সোমবার, ২৬ অক্টোবর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ঢাকা মহানগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণবিষয়ক এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা ২০টি কমিটির সদস্যরা অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তোলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু বড় বড় সরকারি আবাসিক ভবন, অভিজাত আবাসন এবং হাসপাতালেও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি ও এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবীক্ষণ দলগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। কোনো এলাকায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মশার প্রজননস্থল কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুসারে জরিমানাও করা হবে। সরকারি আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের নিজ নিজ বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে বিশেষ দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, নিজেদের আবাসিক ভবন পরিষ্কার রাখতে না পারলে সরকারি বাসায় থাকার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাঁর নির্দেশনায় সরকারি বাসার বরাদ্দ বাতিলের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে কোন ধরনের অপরিচ্ছন্নতার ঘটনায় কী পরিমাণ জরিমানা হবে, বরাদ্দ বাতিলের জন্য কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কী সুযোগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। ফলে বরাদ্দ বাতিলের নির্দেশকে কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সরকারের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টবের নিচের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, পানির পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ এবং অপরিচ্ছন্ন ছাদে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া কিংবা আবর্জনা সরিয়ে ফেললেই পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ হয় না। নিয়মিত পানি জমার স্থান পরীক্ষা করা, পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং মশার বংশবিস্তার বন্ধ করাও জরুরি। সরকারি আবাসিক ভবন ও হাসপাতালের মতো জায়গায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থানে প্রতিদিন অনেক মানুষ বসবাস করেন, চিকিৎসা নেন কিংবা বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করেন। হাসপাতালের আশপাশে পানি জমে থাকা বা আবর্জনা পড়ে থাকলে রোগী, স্বজন ও কর্মীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে। একইভাবে সরকারি কোয়ার্টারে পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি থাকলে সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০টি পরিবীক্ষণ কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে ২৪ অক্টোবর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ২০টি অঞ্চলে একটি করে অঞ্চলভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতে ১০টি করে কমিটি কাজ করবে। এসব কমিটির উদ্দেশ্য শুধু পরিচ্ছন্নতা পর্যবেক্ষণ নয়; নগরীর পরিবেশ উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বাস্তবায়নও তদারকি করা।
এ ধরনের কমিটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত পরিদর্শন, অনিয়মের সঠিক নথি সংরক্ষণ, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর। কোথায় আবর্জনা জমছে, কোন এলাকায় পানি নিষ্কাশনে বাধা রয়েছে, কোথায় মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন স্থাপনায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হচ্ছে না—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা আবার যাচাই করাও জরুরি।
রাজধানীর জলাশয় ও খালগুলোর পরিচ্ছন্নতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, বনানী ও গুলশান লেক পরিষ্কার করে সেগুলোর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাজ করছে। এসব জলাশয় রাজধানীর পরিবেশ, পানি প্রবাহ এবং নগরবাসীর বিনোদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলাশয় পরিষ্কারের পাশাপাশি সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে। সভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৯টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৬টি খাল পুনঃখনন, দেয়াল নির্মাণ ও বর্জ্য আটকানোর জন্য জাল বসানোর কাজ চলছে। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে এই হিসাবে মোট ৫৫টি খাল রয়েছে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ উন্নত করা, বর্জ্য জমে থাকার সমস্যা কমানো এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব কাজের বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু, কোন খালের কাজ শেষ হয়েছে এবং কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে সভার প্রকাশিত বিবরণে পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা দীর্ঘদিনের। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা, খালের জায়গা দখল, পানিনিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি নগরজীবনে নানা সমস্যা তৈরি করে। খাল খনন ও পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নর্দমা রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাল ও জলাশয়ে গৃহস্থালি বর্জ্য কিংবা অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ফেলা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক উদ্যোগ দরকার। আবর্জনা ফেলার পাত্র নিয়েও নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্লাস্টিক ও লোহার পাত্র চুরি হয়ে যাওয়ার সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে ফাইবার বোর্ড দিয়ে নতুন পাত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পর্যায়ক্রমে এসব পাত্র স্থাপন করবে। তবে নতুন পাত্রের সংখ্যা, স্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। নতুন পাত্র স্থাপন করা হলেও সেগুলো নিয়মিত খালি করা, বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং পাত্র ভাঙা বা চুরি হলে দ্রুত প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। অন্যথায় পাত্র বসানোর পরও রাস্তায় আবর্জনা জমে থাকার সমস্যা পুরোপুরি দূর হবে না। নাগরিকদেরও নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং রাস্তা, ফুটপাত, নর্দমা কিংবা জলাশয়ে ময়লা না ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব কেবল সিটি করপোরেশন বা সরকারি কর্মচারীদের নয়; নগরবাসীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবনের মালিকদের নিজ নিজ জায়গা পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। কোনো স্থানে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলা এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে এমন বস্তু জমিয়ে না রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, ২০টি দল সমন্বিতভাবে কঠোর ভূমিকা পালন করতে পারলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ঢাকার পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। এই সময়সীমা সরকারের প্রত্যাশা; এটি ইতিমধ্যে অর্জিত ফলাফল নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের তদারকি, অর্থ ও জনবল ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতা এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর। ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার এই উদ্যোগ সফল করতে নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় কতটি অভিযান হয়েছে, কত স্থানে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতটি খাল পরিষ্কার হয়েছে এবং নতুন বর্জ্যপাত্র কোথায় স্থাপন করা হয়েছে এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা কাজের অগ্রগতি বুঝতে পারবেন। এতে দায়িত্বশীলতা বাড়বে এবং সমস্যাগ্রস্ত এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।