রেডিওতে গান প্রচারের জন্য শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন রকতারকা জিন সিমন্স, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতশিল্পীদের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সংগীতশিল্পীদের স্বত্ব ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনপ্রিয় রক ব্যান্ড কিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা, বেজ গিটারবাদক ও সহপ্রধান কণ্ঠশিল্পী জিন সিমন্স প্রচলিত রেডিওতে গান প্রচারের জন্য শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার দাবিতে কংগ্রেসের শুনানিতে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কোনো শিল্পীর তৈরি গান বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে রেডিও প্রতিষ্ঠান আয় করলে সেই শিল্পী কেন তাঁর পরিবেশনার জন্য সরাসরি পারিশ্রমিক পাবেন না? ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বিচার বিভাগীয় কমিটির মেধাস্বত্ববিষয়ক উপকমিটিতে ‘ডিজিটাল যুগে স্থানীয় রেডিও, গীতিকার ও পরিবেশনশিল্পীদের স্বার্থের ভারসাম্য’ শীর্ষক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে সিমন্সের পাশাপাশি সাউন্ডএক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল হুপে এবং স্থানীয় রেডিও সম্প্রচারক হেনরি হিন্টন অংশ নেন। সেখানে আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল, প্রচলিত বেতার মাধ্যমে গান প্রচারের ক্ষেত্রে শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আইন পরিবর্তন করা উচিত কি না।
সিমন্সের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে সংগীতশিল্পীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সাধারণ এএম ও এফএম রেডিওতে কোনো রেকর্ড করা গান প্রচারিত হলে সেই গানের রেকর্ডিংয়ে অংশ নেওয়া শিল্পীরা সাধারণত শুধু ওই সম্প্রচারের জন্য আলাদা পরিবেশনা-স্বত্বের অর্থ পান না। তবে গানের রচয়িতা ও প্রকাশনার স্বত্বাধিকারীদের ক্ষেত্রে গানের রচনা ও সংশ্লিষ্ট স্বত্ব অনুযায়ী অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। ফলে গানের কথা ও সুরের মালিকানা এবং রেকর্ড করা গান পরিবেশনের অধিকার—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। এই পার্থক্যই বর্তমান বিতর্কের মূল বিষয়। শিল্পীদের বক্তব্য, একটি গান তৈরি করতে কণ্ঠশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, প্রযোজক ও অন্যান্য পেশাজীবীর শ্রম লাগে। রেডিওতে সেই গান প্রচারের মাধ্যমে শ্রোতা আকৃষ্ট হয় এবং বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ আয় করা সম্ভব হয়। অথচ রেকর্ডিংয়ে অংশ নেওয়া শিল্পীরা শুধু প্রচলিত রেডিও সম্প্রচারের কারণে সরাসরি পারিশ্রমিক না পেলে তাঁদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না।
সিমন্স শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতশিল্পীদের জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার পক্ষে বক্তব্য দেন। তাঁর লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, সংগীতশিল্পীদের তৈরি কাজ থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া গেলে সেই শিল্পীদেরও তার ন্যায্য অংশ পাওয়া উচিত। তিনি প্রস্তাবিত আইনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিষয়টিকে শিল্পীদের শ্রমের স্বীকৃতি এবং সংগীতশিল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করেন। সিমন্সের বক্তব্যে আরও উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতশিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিষয়টি। রক, ব্লুজ, জ্যাজ, পপ ও অন্যান্য ধারার সংগীত বিশ্বজুড়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে। এসব সংগীতের জনপ্রিয়তা তৈরিতে শিল্পীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, শিল্পীরা যদি নিজেদের কাজের যথাযথ আর্থিক স্বীকৃতি না পান, তাহলে নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য পেশাটিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রস্তাবিত ‘আমেরিকান মিউজিক ফেয়ারনেস অ্যাক্ট’, যার মূল লক্ষ্য প্রচলিত এএম ও এফএম রেডিওতে রেকর্ড করা গান প্রচারের জন্য শিল্পীদের পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে রেডিও সম্প্রচারক ও সংগীতশিল্পীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলে যেতে পারে। তবে আইনটি নিয়ে সমর্থন ও বিরোধিতা—দুই পক্ষেরই যুক্তি রয়েছে।
শিল্পীদের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, গান তৈরি ও রেকর্ড করার পেছনে বিপুল সময়, দক্ষতা ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। একটি গান বহু বছর ধরে রেডিওতে প্রচারিত হতে পারে এবং সেই গান থেকে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন আয় করতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা সরাসরি পরিবেশনা-স্বত্বের অর্থ না পেলে সেই আয়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক সীমিত থেকে যায়। তাঁদের মতে, অন্য ডিজিটাল সংগীতসেবা ও উপগ্রহভিত্তিক রেডিওতে রেকর্ড করা গান প্রচারের জন্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা থাকলেও প্রচলিত রেডিওর ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম বজায় থাকা ন্যায্যতার প্রশ্ন তৈরি করে। সাউন্ডএক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল হুপেও এই অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দেন। তাঁর যুক্তি, ডিজিটাল সংগীতসেবা ও উপগ্রহভিত্তিক সম্প্রচারে শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও প্রচলিত রেডিওতে একই ধরনের স্বত্বের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, এই ব্যবধান দূর করা হলে সংগীতশিল্পীদের অধিকার আরও সুসংহত হবে এবং বিদেশে তাঁদের কাজের জন্য অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে স্থানীয় রেডিও সম্প্রচারকদের সংগঠন এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নতুন পারিশ্রমিকের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে ছোট শহর, গ্রামীণ অঞ্চল এবং সীমিত আয়ের স্থানীয় রেডিও স্টেশনগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। অনেক স্থানীয় স্টেশন সংবাদ, আবহাওয়ার তথ্য, জরুরি সতর্কতা এবং এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রচার করে। তাদের মতে, অতিরিক্ত আর্থিক চাপ এসব সেবার ধারাবাহিকতা দুর্বল করতে পারে। শুনানিতে অংশ নেওয়া সম্প্রচারক হেনরি হিন্টন স্থানীয় রেডিওর এই ভূমিকার ওপর জোর দেন। তাঁর অবস্থান অনুযায়ী, রেডিওতে গান প্রচার শিল্পীদের পরিচিতি বাড়ায়, নতুন শ্রোতা তৈরি করে এবং সরাসরি অনুষ্ঠান ও অন্যান্য মাধ্যমে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রচলিত ব্যবস্থায় নতুন অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা আরোপের আগে ছোট সম্প্রচারকদের সামর্থ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। এই কারণে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে বিতর্কটি শুধু সংগীতশিল্পীদের পারিশ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা, বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসার কাঠামো, সংগীতের প্রচার এবং স্বত্বের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন। একদিকে শিল্পীরা তাঁদের সৃষ্টিশীল শ্রমের জন্য আর্থিক স্বীকৃতি চান, অন্যদিকে সম্প্রচারকেরা আশঙ্কা করছেন, নতুন ব্যয় তাঁদের ব্যবসাকে দুর্বল করতে পারে। কংগ্রেসের সামনে এখন এই দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সিমন্সের অংশগ্রহণের কারণে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সংগীতজগতে পরিচিত একটি ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কিসের মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর মতো জনপ্রিয় শিল্পী যখন সংগীতশিল্পীদের আর্থিক অধিকার নিয়ে আইনপ্রণেতাদের সামনে বক্তব্য দেন, তখন বিষয়টি সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সংগীতশিল্পের নীতিনির্ধারকদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করে।
প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে কোন ধরনের শিল্পী কত অর্থ পাবেন, ছোট রেডিও স্টেশনগুলোর জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে কি না এবং অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু শিল্পীদের অধিকার নিশ্চিত করাই নয়, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র সম্প্রচারকদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে। এ কারণে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রস্তাবিত ব্যবস্থার বিস্তারিত মূল্যায়ন ছাড়া চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এদিকে জিন সিমন্সকে নিয়ে প্রচারিত বার্তায় বলা হয়েছে, তিনি ড্যান বলের উপস্থাপনায় ‘রিয়েল আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে বিশেষ সাক্ষাৎকার দেবেন। সেখানে সিনেটের শুনানিতে তাঁর অংশগ্রহণ এবং সংগীতশিল্পীদের পারিশ্রমিকের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে বার্তাটি থেকে ধারণা পাওয়া যায়। তবে অনুষ্ঠানটির প্রচারের নির্দিষ্ট তারিখ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের প্রেক্ষাপটে সাক্ষাৎকারটি পরদিনই সম্প্রচারিত হবে—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। সব মিলিয়ে, প্রচলিত রেডিওতে গান প্রচারের জন্য শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতশিল্পে দীর্ঘদিনের একটি নীতিগত বিতর্ক। জিন সিমন্সের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। প্রস্তাবিত আইন ভবিষ্যতে কতটা অগ্রসর হবে, তা নির্ভর করবে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত, আইনপ্রণেতাদের সমর্থন এবং শিল্পী ও সম্প্রচারকদের স্বার্থের মধ্যে কীভাবে সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় তার ওপর। আপাতত নিশ্চিত বিষয় হলো, শিল্পীদের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন এবং স্থানীয় রেডিওর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।