অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মিশিগানে রিপাবলিকানদের জেতাতে ট্রাম্পের প্রচার, ভোটারদের দিলেন বিশেষ বার্তা
মিশিগানের পোর্ট হুরনে সমাবেশ করে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে দুই দলের প্রচার আরও তীব্র হয়েছে।
৮,৬৫৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
পোর্ট হুরনের ম্যাকমরান প্লেসে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে মিশিগানের বিভিন্ন এলাকার রিপাবলিকান সমর্থকেরা অংশ নেন। ট্রাম্পের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সেখানে দলীয় প্রচার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং বিরোধী প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে আসে। এই সমাবেশটি ছিল ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রচার কর্মসূচির একটি। মিশিগানে সিনেট ও গভর্নর পদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ট্রাম্পের প্রচারের প্রধান লক্ষ্য ছিল মাইক রজার্সকে সিনেটে এবং জন জেমসকে গভর্নর পদে নির্বাচিত করতে ভোটারদের উৎসাহিত করা। রজার্স আগে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে জেমসও কংগ্রেসের সদস্য এবং এবার অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সমাবেশে ট্রাম্প রজার্সের প্রশংসা করেন এবং তাঁকে দেশের অন্যতম সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। জেমসের ক্ষেত্রেও তিনি কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং দ্রব্যমূল্য কমানোর মতো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের সমালোচনা। তিনি এল-সায়েদের ধর্মীয় পরিচয় এবং কথিত রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ তোলেন। সমাবেশে ট্রাম্প তাঁকে উগ্রপন্থার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য বলে দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার মতো প্রমাণ সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। এল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগে মিশিগানের একটি জনসভায় তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে নির্বাচনী প্রচারের সময় করা রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা জরুরি।
এই বিতর্কের কারণে মিশিগানের নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এল-সায়েদ নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সমর্থকদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে প্রার্থীদের নীতি, কর্মসূচি এবং জনস্বার্থে তাঁদের অবস্থান বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবিরের প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক প্রচারে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সমাবেশে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট গভর্নর পদপ্রার্থী জোসেলিন বেনসনের বিরুদ্ধেও বক্তব্য দেন। বেনসন বর্তমানে মিশিগানের অঙ্গরাজ্য সরকারের নির্বাচনী প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত এবং গভর্নর পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোট গণনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তাঁর সমালোচনা করেন। তবে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে রাজনৈতিক নেতার অভিযোগ করলেই তা প্রমাণিত হয় না। এ ধরনের দাবি যাচাইয়ের জন্য আদালতের নথি, নির্বাচন কর্তৃপক্ষের তথ্য এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। বেনসনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তার পক্ষে প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার।
নির্বাচনের আগে মিশিগানে দুই দলের প্রচার কার্যক্রমও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রাম্পের সমাবেশের আগের দিন, শনিবার, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। সেখানে এল-সায়েদ এবং গভর্নর পদপ্রার্থী বেনসনকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। একদিকে ট্রাম্প রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে ওবামার উপস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থকদের নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টার অংশ। দুই নেতার পরপর প্রচার কর্মসূচি মিশিগানের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
মিশিগানের সিনেট নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান মাইক রজার্স এবং ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সিনেটের দলীয় ভারসাম্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে, তার ওপর আইন পাস, সরকারি নিয়োগ অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মিশিগানের ভোট শুধু অঙ্গরাজ্যের রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় পর্যায়েও এর তাৎপর্য রয়েছে।
সমাবেশে ট্রাম্প অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়েও কথা বলেন। কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত বিরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যবিরোধ শিগগির সমাধান হতে পারে। তবে সম্ভাব্য সমঝোতার বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি। কানাডার পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হবে। কিন্তু মিশিগানের অর্থনীতির জন্য বিষয়টি জটিল, কারণ অঙ্গরাজ্যটির গাড়ি নির্মাণশিল্প কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শুল্কের প্রভাব উৎপাদন খরচ, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে।
রজার্সও শুল্কনীতির সব দিক নিয়ে পুরোপুরি একমত নন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিনি কিছু শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বললেও গাড়িশিল্পের ওপর কানাডার শুল্কসংক্রান্ত নীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিক নীতির কিছু বিষয় নিয়ে তাঁদের নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে মিশিগানে গাড়ি নির্মাণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থান বহু পরিবারের আয়ের সঙ্গে জড়িত। তাই ভোটাররা শুধু দলীয় পরিচয় নয়, বাণিজ্যনীতি ও কর্মসংস্থানের বাস্তব প্রভাবও বিবেচনা করতে পারেন।
সমাবেশে ট্রাম্প আরেকটি আর্থিক প্রতিশ্রুতিও দেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমলাইভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তবে এই বক্তব্যকে অনুমোদিত সরকারি কর্মসূচি বা নিশ্চিত অর্থপ্রদানের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমন কোনো অর্থপ্রদান বাস্তবায়িত হবে কি না, তার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা, অর্থের উৎস এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন সম্পর্কে তথ্য থাকা দরকার। নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবে কার্যকর হওয়া সরকারি কর্মসূচি এক বিষয় নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সমাবেশের তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে দলীয় সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করা এবং নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের প্রচারকে সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আনা। তবে সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি মানেই নির্বাচনে জয় নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। মিশিগানের নির্বাচনে স্বাধীন ভোটার, শহর ও গ্রামীণ এলাকার ভোটার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমলাইভে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে একই মঞ্চে থাকা রজার্সের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, আবার কিছু ভোটারের কাছে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক নেতিবাচক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পোর্ট হুরনের এই সমাবেশ মিশিগানে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে রজার্স ও জেমসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণ করেছেন এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে সমাবেশের বক্তব্য থেকে নির্বাচনের ফলাফল অনুমান করা সম্ভব নয়। আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটে ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থীরা জয়ী হবেন এবং কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যে কী পরিবর্তন আসবে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দাবি, অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করে দেখা ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬

রেকর্ড ভোটে সার্বিয়ায় বিদায়ের মুখে ভুচিচ, শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক জয়ে বদলাচ্ছে দেশের রাজনীতি

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে নজিরবিহীন প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রে

মাইক রজার্সের প্রচারে ট্রাম্প, মিশিগানের নির্বাচনে বাড়ছে উত্তাপ



মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।