অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
রেকর্ড ভোটে সার্বিয়ায় বিদায়ের মুখে ভুচিচ, শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক জয়ে বদলাচ্ছে দেশের রাজনীতি
রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণে সার্বিয়ায় ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে শিক্ষার্থীসমর্থিত আন্দোলন, আর দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের রাজনৈতিক আধিপত্য পড়েছে বড় চ্যালেঞ্জের মুখ
৯,৬৫৫ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচন। প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীদের তালিকা ক্ষমতাসীন শিবিরকে বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী আলেকসান্দার ভুচিচও পরাজয় স্বীকার করেছেন। ভোটের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, এই নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠেছে।
সার্বিয়ার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৮ হাজার ১৩৫টি ভোটকেন্দ্রের ফল গণনার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা পেয়েছে ৫২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে, ভুচিচের নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ সার্বিয়া জোট পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ ভোট। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইভিৎসা দাচিচের নেতৃত্বাধীন তালিকা পেয়েছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ ভোট। তবে নির্বাচন কমিশনের ফল গণনা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে আসনসংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা সিআরটিএর প্রাথমিক হিসাবেও শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকার বড় জয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রায় ৫২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদের ১৩৮টি আসন পেতে পারে। ভুচিচের জোট পেতে পারে প্রায় ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট এবং ১০৩টি আসন। এই হিসাব পর্যবেক্ষণ করা ভোটকেন্দ্রের নমুনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি; তাই চূড়ান্ত সরকারি ফলাফলে কিছু পার্থক্য হতে পারে।
নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ফলাফলকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। রয়টার্সের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, আর ভুচিচের জোট পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ। ওই হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা ২৫০ আসনের সংসদে প্রায় ১৩৯টি আসন পেতে যাচ্ছিলেন। ফলে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে জনসমর্থনের একটি সুস্পষ্ট বার্তা সামনে এসেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ, যা দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পরিচয় দেয়। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ভোটারদের এই উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এই নির্বাচনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে জনমনে জমে থাকা প্রশ্ন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর নির্মাণকাজের মান, সরকারি তদারকি এবং দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেবল একটি দুর্ঘটনার বিচার চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে না এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগের কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। তাঁদের দাবি ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে হবে এবং নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। এই দাবিগুলো সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যেও সমর্থন পায়। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সময়ের সঙ্গে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
ভুচিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীদের এই জয় দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যও জনসমর্থনের পরিবর্তনের মুখে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই বছর ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর এই ফলাফল দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নির্বাচনের আগে ভুচিচ রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে আগাম নির্বাচনের পথে এগিয়ে যান। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে নির্ধারণের চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা সংসদের ২৫০টি আসনের জন্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন। তাঁদের তালিকায় শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদ, কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। এই বৈচিত্র্য আন্দোলনটিকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে একটি বিস্তৃত নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করে।
তবে শিক্ষার্থীদের জয় মানেই সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্দোলনের শক্তি ছিল দুর্নীতিবিরোধী দাবি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজেট, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো জটিল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা এবং একটি কার্যকর সংসদীয় দল হিসেবে কাজ করাও হবে বড় পরীক্ষা। ক্ষমতার বাইরে থেকে সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থার পর্যবেক্ষকেরা ২৬ অক্টোবরের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলেছেন, ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল জোরালো। তবে তাঁরা নির্বাচনী পরিবেশে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতাসীনদের তুলনামূলক সুবিধা, সরকারি সম্পদের সম্ভাব্য অপব্যবহার, ভোটারদের ওপর চাপ এবং প্রচার কার্যক্রমে বাধার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, গণমাধ্যমে প্রচারের ভারসাম্যহীনতাও ভোটারদের সামনে নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়ার সুযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সিআরটিএও ভোটকেন্দ্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ব্যালটের ছবি তোলা, ভোটার পরিচয় যাচাইয়ে ঘাটতি, ভোট কেনার চেষ্টা এবং ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের অর্থ এই নয় যে পুরো নির্বাচন অবৈধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করতে অভিযোগগুলো তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই ফলাফলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নির্ভর করবে।
এই ফলাফল ইউরোপের অন্যান্য দেশেও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। সার্বিয়ার ঘটনায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা নাগরিক আন্দোলন নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলাদা। সার্বিয়ার অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু একই ফলাফল অন্য কোথাও ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নির্বাচনী বিজয়ে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে জনসমর্থন, সংগঠন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সার্বিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন রাজনৈতিক শক্তি জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে। দুর্নীতি দমন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, আইনের শাসন এবং শিক্ষার উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অধিকার রক্ষা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। কারণ গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সাফল্য শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্বাচনের পর প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর হয়ে ওঠে, তার ওপরও নির্ভর করে।
সব মিলিয়ে, সার্বিয়ার এই নির্বাচন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকার বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা এবং ভুচিচের পরাজয় স্বীকার দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে ফলাফলের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নতুন সংসদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে, এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেবল নির্বাচনী সাফল্য নয়, সার্বিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।