এক লাখ ডলারের কর্মভিসা ফিতে আদালতের বাধা, বিদেশি কর্মীদের কী প্রভাব পড়বে?
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এইচ-১বি কর্মী নিয়োগে এক লাখ ডলারের ফি আদায়ের নীতিতে আদালতের বাধা এসেছে। এতে নিয়োগকর্তা ও বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য কী পরিবর্তন হলো, জেনে নিন।
যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এক লাখ ডলারের বিশেষ ফি আরোপের নীতিতে ফেডারেল আদালতের বাধা এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চালু করা এই নীতি নিয়ে একাধিক আইনি লড়াইয়ের মধ্যে আদালতের নির্দেশে ফি আদায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আপাতত কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের আপিল চলমান থাকায় ভবিষ্যতে নীতিটির কী পরিণতি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতের বিচারক হেইউড গিলিয়াম জুনিয়র এই ফি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সরকারি সংস্থাগুলোর নির্দেশনা ও নীতিমালা কার্যকর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নিয়ম প্রণয়ন ও জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ফি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছিল। এ কারণে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই নীতির প্রয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে জুন মাসে ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল আদালতও এক লাখ ডলারের ফি নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আপিল আদালত সেই রায় স্থগিত করার সরকারি আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে দুটি পৃথক মামলায় আদালতের পদক্ষেপের কারণে ফি আদায়ের নীতি কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি। তবে এসব সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে নতুন কোনো নিয়মের মাধ্যমে একই ধরনের ফি আরোপের সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এইচ-১বি কর্মভিসা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভিসার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত পেশায় দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ এই কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নির্দিষ্ট নতুন এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের এক লাখ ডলারের ফি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই নীতি আরও এক বছরের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এইচ-১বি কর্মসূচির অপব্যবহার ঠেকানো এবং তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে নীতিটির বিরোধীরা বলছেন, এত বড় অঙ্কের ফি দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগকে ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মী সংকট বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে এক লাখ ডলারের এই ফি সব এইচ-১বি কর্মী কিংবা সব ধরনের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। মূলত নির্দিষ্ট নতুন আবেদন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে কর্মী নিয়োগের কিছু ক্ষেত্রে এটি আরোপ করার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বৈধ অবস্থানে থাকা কর্মীর ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অবস্থার পরিবর্তনের আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এই ফি প্রযোজ্য ছিল না। আগে থেকে বৈধ এইচ-১বি ভিসা থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও নিয়মটি সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য ছিল না।
আদালতের নির্দেশের ফলে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের জন্য ওই এক লাখ ডলারের ফি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা যাচ্ছে না। তবে বিদেশি কর্মীদের জন্য এর অর্থ এই নয় যে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পেয়ে যাবেন। এইচ-১বি ভিসার অন্যান্য যোগ্যতা, নিয়োগকর্তার আবেদন, অনুমোদন, যাচাই-বাছাই এবং প্রচলিত অভিবাসন আইন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের নির্দেশ কেবল নির্দিষ্ট ফি নীতির প্রয়োগকে প্রভাবিত করেছে; পুরো ভিসা কর্মসূচি বাতিল করেনি।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত ব্লুমবার্গ ল–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার নবম সার্কিট আপিল আদালতে রায়টি বাতিল করার আবেদন জানায়। ফলে আইনি বিরোধ এখনো শেষ হয়নি। একই সঙ্গে সরকার এক লাখ ডলারের কাছাকাছি ফি স্থায়ীভাবে চালুর জন্য আলাদা নিয়ম প্রণয়নের উদ্যোগও নিয়েছে। প্রস্তাবিত এই নিয়ম চূড়ান্ত হলে সেটি নিয়ে নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চদক্ষতার পেশায় কাজ করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণার মতো খাতে চাকরি খুঁজছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়োগকর্তারা এই নীতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে আদালতের রায়ের কারণে কোনো নির্দিষ্ট বাংলাদেশি আবেদনকারী সরাসরি ভিসা পাবেন বা তাঁর আবেদন দ্রুত অনুমোদিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এক লাখ ডলারের এইচ-১বি ফি নিয়ে আদালতের নির্দেশ বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। আপাতত সংশ্লিষ্ট ফি আদায় বন্ধ থাকলেও সরকারের আপিল, আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং নতুন নিয়ম প্রণয়নের অগ্রগতির ওপর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করছে। তাই বিদেশি কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের জন্য সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।