যুদ্ধ থামাতে নভেম্বরে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বৈঠক, জট খুলবে কি শান্তি আলোচনার?
যুদ্ধের অবসান ও শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে নভেম্বরে বৈঠকে বসতে পারে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া; তবে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা শান্তি আলোচনা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে আগামী নভেম্বর মাসে তিন দেশের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তবে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও যুদ্ধের অবসান কিংবা স্থায়ী শান্তিচুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের নিয়ে নভেম্বরের প্রথমার্ধে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য বৈঠকের স্থান হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির নাম আলোচনায় এসেছে। তবে বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ, প্রতিনিধিদলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং চূড়ান্ত কর্মসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়েই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই নতুন উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার পথ তৈরির চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও নভেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন পক্ষের বৈঠকের পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে যুদ্ধের মূল কারণ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে। এসব বিষয়ে সমঝোতা ছাড়া কেবল বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো কঠিন হবে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আলোচনার প্রথম পর্যায়ে প্রতিনিধিদলগুলো কারিগরি ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে। যুদ্ধবিরতির শর্ত, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, মানবিক উদ্যোগ এবং পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার কাঠামো নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের পর্যায়ে বৈঠক প্রয়োজন হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এ ধরনের শীর্ষ বৈঠকের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। জেলেনস্কি বলেছেন, কোনো শান্তিচুক্তির পরও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধ বন্ধের নামে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নতুন করে আক্রমণের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। ফলে শান্তি আলোচনায় শুধু যুদ্ধ থামানো নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, ভূখণ্ডের প্রশ্নে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্ট। জেলেনস্কি মনে করেন, ভূখণ্ডসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আলোচক দলের কারিগরি পর্যায়ে চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়; এ ধরনের বিষয় রাষ্ট্রপ্রধানদের পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে দেশটির স্বার্থ রক্ষা করতে হবে বলে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অবস্থান রাশিয়ার সম্ভাব্য দাবির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে। ফলে আলোচনার টেবিলে বসা সম্ভব হলেও মূল রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ হবে না।
ইউরোপীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জেলেনস্কির মতে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং ইউরোপের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই যুদ্ধ সরাসরি জড়িত। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি ইউরোপীয় অংশীদারদেরও প্রক্রিয়াটিতে যুক্ত রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে, প্রাথমিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মূল কাঠামোতে তিন দেশের আলোচক দলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপের ভূমিকা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আবুধাবিতে এবং ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় কয়েক দফা আলোচনা হয়েছিল। এসব বৈঠকে যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের মতো মানবিক বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক প্রশ্নে বড় ধরনের সমঝোতা হয়নি। ফলে নতুন বৈঠক ঘিরে আশাবাদ থাকলেও আগের অভিজ্ঞতা সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা আলোচনার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ, ইউরোপের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের পথ সহজ হতে পারে। তবে স্থায়ী শান্তির জন্য উভয় পক্ষের সম্মতি ও কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা প্রয়োজন।
নভেম্বরের সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পথে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে বৈঠক আয়োজন, যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তি এগুলো আলাদা ধাপ। নির্দিষ্ট তারিখ ও কর্মসূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামবে কি না, তা নির্ভর করবে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার মতো জটিল প্রশ্নে তিন পক্ষ কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।