অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মামলা প্রত্যাহারের পরও ট্রাম্পের আইনজীবীদের শাস্তি, বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত চান জিম জর্ডান
মামলা প্রত্যাহারের পর ট্রাম্পের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় বিচারক ক্যাথলিন উইলিয়ামসের নিরপেক্ষতা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন জিম জর্ডান।
৮,৬৩৫ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করসংক্রান্ত মামলা এবং তাঁর আইনজীবীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনোনীত ফেডারেল বিচারক ক্যাথলিন উইলিয়ামসের কর্মকাণ্ড তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটির চেয়ারম্যান জিম জর্ডান। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করার পরও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের যথার্থতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছেন। তবে বিচারকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্প, তাঁর দুই ছেলে এবং তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের বিরুদ্ধে করা একটি মামলা। ট্রাম্পের করসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলাটি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মামলাটি প্রত্যাহার, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা, প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং বিচারকের শাস্তিমূলক আদেশ—সব মিলিয়ে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
তদন্তের দাবিতে জর্ডানের চিঠি
২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক সম্মেলনের কাছে চিঠি দিয়ে বিচারক উইলিয়ামসের আচরণ পর্যালোচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের আদালতবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ড্যারেল ইসা। তাঁদের বক্তব্য, মামলার বাদীপক্ষ স্বেচ্ছায় মামলা প্রত্যাহার করার পর বিচারকের শাস্তিমূলক আদেশ দেওয়ার সময় ও পদ্ধতি বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জর্ডান ও ইসার অভিযোগ, বিচারক এমন একটি আদেশ দিয়েছেন, যার পক্ষে একাদশ সার্কিট আপিল আদালতের প্রাসঙ্গিক নজির রয়েছে কি না, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। তাঁরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, মামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়—এমন একটি পক্ষের জমা দেওয়া বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বিচারক ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে তাঁদের ধারণা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জর্ডান ও ইসা বিচারকের আচরণ নিয়ে তদন্ত চাইছেন; তাঁদের অভিযোগ নিজে থেকে বিচারকের অসদাচরণ প্রমাণ করে না। একইভাবে, কোনো মামলা প্রত্যাহার হলেই আদালত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের পূর্ববর্তী আচরণ পর্যালোচনার সব ক্ষমতা হারায়—এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না। বিষয়টি নির্ভর করে আদালতের ক্ষমতা, মামলার পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য আইনি নজিরের ওপর।
১০ বিলিয়ন ডলারের মামলার পটভূমি
ট্রাম্প, তাঁর দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর করসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়া ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ওই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার চার্লস লিটলজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। পরে মে মাসে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মামলা প্রত্যাহার করা হয়। একই সময় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতার বিষয় সামনে আসে, যার মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থকদের অভিযোগ করা সরকারি হয়রানির ক্ষতিপূরণের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৭৭৬ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা ছিল।
সমঝোতাটি নিয়ে বিতর্কের কারণ ছিল শুধু অর্থের পরিমাণ নয়। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, প্রেসিডেন্টের অধীনস্থ সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে তাঁর নিজের করা মামলায় সরকার এমন শর্তে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, যা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পরিবারের সম্ভাব্য করসংক্রান্ত দায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের আইনজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি তাই বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সরকারি সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত তহবিলটি পরে রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধের মুখে পড়ে। বিরোধিতা শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রিপাবলিকানদের মধ্যেও এ নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরবর্তী সময়ে ওই তহবিল গঠনের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। তবে তহবিলের পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং মামলার আইনজীবীদের বিরুদ্ধে বিচারকের আদেশ—দুটি আলাদা আইনি বিষয়। একটির পরিণতি দিয়ে অন্যটির বৈধতা নির্ধারণ করা যায় না।
বিচারকের আদেশে দুই আইনজীবীকে শাস্তি
বিচারক উইলিয়ামস ১৩ জুলাইয়ের আদেশে ট্রাম্পের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। আইনজীবী আলেহান্দ্রো ব্রিতোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পেশাগত শাস্তির বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য ফ্লোরিডার আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পাঠানো হয়। অন্য আইনজীবী ড্যানিয়েল এপস্টেইনকে অন্তত এক বছরের জন্য তাঁর আদালতের এখতিয়ারে আইনচর্চা করতে নিষেধ করা হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিচারকের পর্যবেক্ষণ ছিল, মামলাটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করা যায়। তাঁর মতে, মামলার উদ্দেশ্য এবং সরকারের সঙ্গে করা সমঝোতার প্রকৃতি আদালতের প্রক্রিয়াকে অনুপযুক্তভাবে ব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জর্ডান ও ইসা অবশ্য বিচারকের এই পদক্ষেপের সময় এবং ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, মামলা প্রত্যাহারের পর বাইরের একটি গোষ্ঠীর বক্তব্যের ভিত্তিতে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁরা বিচারিক আচরণবিধি অনুসরণের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করেছেন।
গণতন্ত্রপন্থী সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
এই বিরোধে আলোচনায় এসেছে ডেমোক্রেসি ডিফেন্ডার্স অ্যাকশন নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটি ৩৫ জন সাবেক ফেডারেল বিচারকের পক্ষে আদালতে বক্তব্য জমা দিয়েছিল বলে তাদের নিজস্ব বিবৃতিতে উল্লেখ রয়েছে। তাদের বক্তব্যে মামলাটি পুনরায় খোলার আহ্বান জানানো হয় এবং ট্রাম্প ও সরকারের মধ্যকার সমঝোতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
জর্ডানের অভিযোগ, বিচারক ওই সংগঠনের জমা দেওয়া বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেছেন, যদিও সংগঠনটি মূল মামলার কোনো পক্ষ ছিল না। তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কোনো বাইরের পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার যথার্থতা যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সংগঠনটি দাবি করেছে, মামলার সমঝোতা ও প্রস্তাবিত তহবিলের বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা প্রয়োজন ছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী এবং সরকারের আইনজীবীদের মধ্যে এমন সমঝোতা হয়েছিল, যা সাধারণ বিরোধপূর্ণ মামলার মতো ছিল না। ফলে সংগঠনটি মনে করে, আদালতের সামনে বিষয়টি তুলে ধরা জনস্বার্থের অংশ ছিল।
আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত কী বলছে
এই মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, একাদশ সার্কিট আপিল আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের আইনজীবী ও বিচার বিভাগের শাস্তিমূলক আদেশ স্থগিত করার আবেদন নাকচ করে। তিন বিচারকের প্যানেল তাৎক্ষণিকভাবে আদেশ আটকে দিতে রাজি হয়নি। ফলে বিচারক উইলিয়ামসের আদেশ তখনকার মতো বহাল থাকে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে বিচারকের বিরুদ্ধে জর্ডানের অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আপিল আদালত মূলত তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশের আবেদন বিবেচনা করেছিল। আদালত আরও বলেছিল, ব্রিতোর বিরুদ্ধে আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পাঠানো বিষয়টি এমন চূড়ান্ত আদেশ নয়, যার বিরুদ্ধে ওই পর্যায়ে আপিল করা যায়। একই সঙ্গে সমঝোতা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ আইনি কার্যক্রমে উল্লেখ করার ওপর বিচারকের নিষেধাজ্ঞাকে আদালত সীমিত পরিসরের বলে বিবেচনা করে।
আপিল আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের আইনজীবী ও বিচার বিভাগ মামলাটি কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল এবং সমঝোতাটি অনুচিত ছিল না—এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। ফলে শাস্তিমূলক আদেশের বিরুদ্ধে তাঁদের যুক্তি তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে জর্ডানের বিচারিক অসদাচরণের অভিযোগ ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
এখন কী হতে পারে
জর্ডান ও ইসা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক সম্মেলনকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে একাদশ সার্কিটের বিচারিক কাউন্সিল বা অন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁদের চিঠিতে ৫ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে বলা হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, বিচারক উইলিয়ামস মামলা প্রত্যাহারের পরও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিচারিক ক্ষমতার সীমা মেনে চলেছেন কি না। পাশাপাশি, বাইরের পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা, আদেশের সময় এবং আইনজীবীদের পেশাগত অবস্থার ওপর এর প্রভাব—এসব বিষয়ও পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। রিপাবলিকান নেতারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, কিছু বিচারক ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। বিপরীতে ট্রাম্পের সমালোচকেরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থ, সরকারি ক্ষমতা এবং করদাতাদের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আদালতের স্বাধীন পর্যালোচনা জরুরি।
তবে এই রাজনৈতিক অবস্থানগুলোর কোনোটিই একা মামলার আইনি সত্য নির্ধারণ করে না। বিচারক উইলিয়ামসের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হলে বিচারিক আচরণবিধি, সংশ্লিষ্ট আদেশ, প্রযোজ্য আইন এবং পর্যালোচনাকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত দেখতে হবে।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬

মিশিগানে ওকাসিও-কর্টেজ, রাজনীতিতে টাকার প্রভাব কমাতে জোরালো প্রচার

ট্রাম্পের সমর্থনে গভর্নর পদে অ্যান্ডি বিগস, চার অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের জয়ের ডাক

দুর্নীতির অভিযোগ, ট্রাম্পের সমর্থন ঘিরে মিনেসোটার সিনেট লড়াইয়ে চাপে দুই প্রার্থী





