শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় মামদানি, নেতৃত্বের মানবিক দৃষ্টান্ত গড়ছেন নিউইয়র্কের মেয়র
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি গ্রেসি ম্যানশনের সবুজ মাঠে শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলে নেতৃত্বের মানবিকতা, সম্প্রীতি ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় মামদানি, নেতৃত্বের মানবিক দৃষ্টান্ত গড়ছেন নিউইয়র্কের মেয়র
৮,৫৩৫ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
নিউইয়র্কের সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশন শুধু মেয়রের বসবাসের জায়গা নয়, এটি নগরীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়েরও একটি অংশ। এখানে মেয়রের সঙ্গে শিশুদের খেলাধুলার দৃশ্য সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রতিনিধিদের আরও কাছের মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এমন পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তারা বড় পদে থাকা মানুষকে দূরের কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে না দেখে একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিনতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশংসামূলক বার্তার মূল বক্তব্যও সেটিই। সেখানে বলা হয়েছে, নেতৃত্বের অর্থ শুধু বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাজেট নিয়ে কাজ করা কিংবা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা নয়; মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলাও নেতৃত্বের অংশ। শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে মাঠে নামা সেই বার্তার একটি প্রতীকী প্রকাশ। তবে এই নির্দিষ্ট খেলার তারিখ, অংশগ্রহণকারী শিশুদের পরিচয় এবং ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত তথ্যের বদলে প্রচারিত দাবির প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত। মামদানি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর প্রশাসনের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নগরীর জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট, সরকারি পরিষেবার মান এবং বাজেটের ঘাটতি মোকাবিলা করা। নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বড় শহরগুলোর একটি। এখানে বাড়িভাড়া, শিশুর যত্ন, যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বহু পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মেয়রের জনপ্রিয়তা কেবল ব্যক্তিগত আচরণের ওপর নয়, এসব সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে পারার ওপরও নির্ভর করবে।
মামদানির প্রশাসনের প্রকাশিত প্রথম ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নগরীর বড় ধরনের অপরাধের সংখ্যা আগের তুলনায় দুই শতাংশের বেশি কমে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৬৬টিতে দাঁড়ায়। একই প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড প্রায় ২০ শতাংশ এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ১৬ শতাংশের বেশি কমার কথা বলা হয়েছে। চুরি করে বাড়িতে প্রবেশ, ছিনতাই এবং মোটরযান চুরির মতো অপরাধেও হ্রাসের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: অপরাধ কমার তথ্য মানেই শহরের অপরাধ সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এমন নয়। সর্বনিম্ন পর্যায়ের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান, অপরাধের ধরন এবং তুলনার ভিত্তি যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপরাধ কমার তথ্য পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি সর্বকালের রেকর্ড বলা যথাযথ হবে না। শিশু ও তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরির বিষয়েও মামদানি প্রশাসন কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে নগরীর আবাসন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ২৬ শতাংশ বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর যুব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য তরুণদের কাজ, শিক্ষা, বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ানো। ফুটবল এখানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নিউইয়র্কের বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফুটবল অত্যন্ত জনপ্রিয়। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের বহু পরিবারের কাছে এই খেলা সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। একই মাঠে ভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও পারিবারিক পটভূমির শিশুরা একসঙ্গে খেলতে পারে। এ কারণে শিশুদের সঙ্গে মেয়রের খেলাধুলা সাধারণ মানুষের কাছে অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
মামদানির প্রশাসন ফুটবলকে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগও নিয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মে মাসে নগর প্রশাসন ঘোষণা করে, পাঁচটি বরোর ৫০টি সরকারি বিদ্যালয়ের আশপাশের সড়কে শিশুদের জন্য ফুটবল খেলার আয়োজন করা হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয়সংলগ্ন কিছু সড়ক যানবাহনমুক্ত করে খেলাধুলা, শিল্পচর্চা ও বাইরের কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা। নগর প্রশাসনের প্রকাশিত ছবি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে মামদানিকে শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে দেখা যায়। এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে ঘিরে উৎসাহ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত জায়গা নেই, সেখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করাও এর একটি উদ্দেশ্য। ব্যস্ত নগরীতে খেলার জায়গা কমে গেলে শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ সীমিত হতে পারে। বিদ্যালয়ের কাছাকাছি সড়ককে সাময়িকভাবে খেলার উপযোগী করে তোলা সেই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান।
তবে এই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতজন শিশু নিয়মিত উপকৃত হচ্ছে, নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে এবং কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও তারা খেলার সুযোগ পাচ্ছে কি না, তার ওপর। একটি ছবি বা একটি দিনের আয়োজন দিয়ে পুরো নগরীর শিশুদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এমন সুযোগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। মামদানির বাজেট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবিটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর প্রশাসন ২০২৭ অর্থবছরের প্রাথমিক বাজেট প্রকাশ করে। সে সময় প্রশাসন আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বলে বর্ণনা করা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের দুই অর্থবছরজুড়ে বাজেটঘাটতির কথা জানায়। সঞ্চয়, সংশোধিত রাজস্বের হিসাব এবং রাজ্য সরকারের সহায়তা বিবেচনায় নেওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গিয়েছিল। সে সময় ধনী বাসিন্দা ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি সম্পত্তি কর বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মে মাসে মামদানি জানান, রাজ্য সরকারের সহায়তা ও ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিকল্পনায় রাজ্য থেকে অতিরিক্ত অর্থ ও অনুমোদন, ব্যয় সাশ্রয় এবং পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কিছু দ্বিতীয় বাড়ির ওপর সম্ভাব্য কর থেকে রাজস্ব পাওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। চূড়ান্ত বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করা আর ধনীদের ওপর নতুন কর কার্যকর করা কিন্তু এক বিষয় নয়। তাই বাজেট ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করা গেলেও সব নতুন কর কার্যকর হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় বলা হয়েছে, শহরের বাইরে বসবাসকারী কোটিপতিদের ওপর কর আরোপ শুরু হয়েছে। এখানে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। মামদানির প্রাথমিক কর প্রস্তাবের একটি অংশ ছিল বছরে দশ লাখ ডলারের বেশি আয় করা নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত আয়কর বাড়ানো। অন্যদিকে, নগরীর বাইরে বসবাসকারীদের মালিকানাধীন পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর আরোপের বিষয়টি আলাদা নীতি। এসব প্রস্তাবের অনুমোদন, কার্যকর হওয়ার সময় এবং কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—তা পৃথকভাবে যাচাই না করে সব কোটিপতিকে নতুন করের আওতায় আনা হয়েছে বলা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। মেয়রের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে প্রশংসা অবশ্য এসব নীতিগত বিতর্ক থেকে আলাদা। একজন জনপ্রতিনিধি শিশুদের সঙ্গে সময় কাটালে তা তাঁর জনসম্পৃক্ততার একটি ইতিবাচক ছবি তুলে ধরতে পারে। কিন্তু শুধু এমন দৃশ্য দেখে তাঁর প্রশাসনের সব সিদ্ধান্ত সফল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। একইভাবে, বাজেট বা অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলার আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি নেতৃত্বকে আরও সহজবোধ্য করে তোলে। শিশুরা যখন কোনো মেয়রকে আনুষ্ঠানিক পোশাক, সভা বা নিরাপত্তাবেষ্টনীর বাইরে খেলতে দেখে, তখন নেতৃত্ব সম্পর্কে তাদের ধারণা আরও বাস্তব হতে পারে। তারা বুঝতে পারে, দায়িত্বশীল পদে থাকা মানুষও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, খেলতে পারেন এবং স্থানীয় জীবনের অংশ হতে পারেন। এমন অভিজ্ঞতা শিশুদের নাগরিক জীবন ও জনসেবার প্রতি আগ্রহী করে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকৃত মানবিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন কেবল প্রতীকী কর্মকাণ্ড দিয়ে নয়, নীতির ফলাফল দিয়েও করতে হবে। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাশ্রয়ী শিক্ষা, নিরাপদ সড়ক, পরিবারের জন্য সহায়তা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি কাজ। ফুটবল খেলার মতো দৃশ্য সেই লক্ষ্যগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও জবাবদিহি।
সব মিলিয়ে, শিশুদের সঙ্গে মেয়র মামদানির ফুটবল খেলার ঘটনাটি তাঁর জনসম্পৃক্ত ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিউইয়র্ক নগর প্রশাসনের নথিতে অপরাধ কমার পরিসংখ্যান এবং শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগের প্রমাণ রয়েছে। বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার দাবিরও সংবাদভিত্তিক সমর্থন পাওয়া যায়। তবে কোটিপতিদের ওপর নতুন কর পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে এবং অপরাধ সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে—এমন দুটি দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে সবচেয়ে নির্ভুল মূল্যায়ন হবে, মামদানি শিশুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও নগরীর বিভিন্ন জনসেবামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে মানবিক নেতৃত্বের একটি ছবি তুলে ধরছেন; তাঁর প্রশাসনের সামগ্রিক সাফল্য নির্ধারিত হবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে।