অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
বুশকন্যা বারবারার ২৫০০ ডলারের অনুদানে টালারিকোর সিনেট লড়াইয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন চমক
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়ে বারবারা বুশ টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর পক্ষে কাজ করা রাজনৈতিক তহবিলে অনুদান দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়ে বারবারা বুশ টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে সমর্থনকারী একটি রাজনৈতিক তহবিলে ২ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান দিয়েছেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর এই অনুদান দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, বুশ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতির অন্যতম পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া রাজনৈতিক তহবিলের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বারবারা বুশ গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘লোন স্টার রাইজিং পিএসি’ নামের একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে এই অর্থ দেন। টালারিকোর সিনেট নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করা সংগঠনটি তাঁর পক্ষে প্রচার ও বিজ্ঞাপন কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করছে। ১৬ অক্টোবর হিউস্টন পাবলিক মিডিয়া এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমেও খবরটি প্রকাশিত হয়।
বারবারার এই অনুদানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। তাঁর বাবা জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি রিপাবলিকান দলের নেতা হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর চাচা নিল বুশও সম্প্রতি টালারিকোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে টেক্সাসের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে বুশ পরিবারের দুই সদস্যের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টেক্সাসে এবারের সিনেট নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান নেতা কেন প্যাক্সটন। প্যাক্সটন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চকক্ষ সিনেটে টেক্সাসের প্রতিনিধিত্ব করবেন। অঙ্গরাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় আসনটি ধরে রাখা কিংবা দখল করা দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
হিউস্টন পাবলিক মিডিয়ার প্রতিবেদনে রাজনৈতিক অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কেটসের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, অনুদানের পরিমাণ বড় রাজনৈতিক প্রচারের তুলনায় কম হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিচিত একটি রিপাবলিকান পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত সংগঠনে প্রকাশ্য অনুদান আসায় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অনুদানের অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ ডলার। নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে এটি বড় অঙ্ক নয়। তবে অনুদানটি এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কাছে গেছে, যার অর্থপ্রাপ্তি ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ্য আর্থিক নথিতে জানানো হয়। কেটাসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বারবারা চাইলে এমন কিছু সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ দিতে পারতেন, যাদের দাতাদের পরিচয় সাধারণত একইভাবে প্রকাশ করতে হয় না। তাই প্রকাশ্য নথিতে নিজের নাম থাকা বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এ থেকে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
টালারিকো নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ধনকুবেরদের পরিবর্তে সাধারণ ভোটারদের মতামত নির্বাচনে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তখন নিজেদের প্রচার চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন। ফলে বড় অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই তাঁর সমর্থক সংগঠনগুলোর অর্থায়ন আলোচনায় রয়েছে।
লোন স্টার রাইজিং পিএসিতে বারবারার অনুদান একমাত্র উল্লেখযোগ্য অর্থসহায়তা নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা রিড হফম্যানও সংগঠনটিতে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন। সংগঠনটি টালারিকোর নির্বাচনী প্রচারকে সহায়তা করছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারেও অর্থ ব্যয় করছে। তবে এসব অনুদান সরাসরি টালারিকোর নিজস্ব নির্বাচনী তহবিলে জমা দেওয়া অর্থের সমান নয়। রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্রার্থীর নিজস্ব প্রচার তহবিলের মধ্যে আইনি ও আর্থিক পার্থক্য রয়েছে।
বারবারা বুশ এর আগেও দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিনি পেনসিলভানিয়ায় কমলা হ্যারিসের পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। হ্যারিস সে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হন। বারবারা নিজেও অতীতে জানিয়েছেন, তিনি নিজেকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ মনে করেন না। ফলে টালারিকোর পক্ষে সহায়তাকারী সংগঠনকে অনুদান দেওয়াকে তাঁর আগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বারবারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বাস্কেটবল সংস্থায় সামাজিক প্রভাব ও অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক দায়িত্বে কাজ করছেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত গ্লোবাল হেলথ কর্পসের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তবে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অনুদানকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে, বারবারার চাচা নিল বুশও টালারিকোর পক্ষে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, টেক্সাসের নির্বাচনে তিনি টালারিকোকে ভোট দিয়েছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী প্যাক্সটনের অতীত কর্মকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যেও দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত সততা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বারবারা বুশ ও নিল বুশের অবস্থান অবশ্য পুরো বুশ পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানকে নির্দেশ করে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ কিংবা তাঁর স্ত্রী লরা বুশ এই অনুদানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানিয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। হিউস্টন পাবলিক মিডিয়ার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বুশ পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তথ্য যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, বারবারার ২ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান, অনুদানের তারিখ এবং লোন স্টার রাইজিং পিএসির নাম একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অনুদান দেওয়ার মূল দাবিটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সমর্থন রয়েছে। তবে এই অনুদানকে জর্জ ডব্লিউ বুশের ব্যক্তিগত সমর্থন কিংবা পুরো পরিবারের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। একইভাবে, অনুদান দেওয়ার অর্থ এই নয় যে বারবারা সরাসরি টালারিকোর নির্বাচনী প্রচার তহবিলে অর্থ দিয়েছেন; অর্থটি গেছে তাঁর পক্ষে কাজ করা একটি রাজনৈতিক সংগঠনে।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনকে ঘিরে বারবারা বুশের অনুদান নির্বাচনী অর্থায়ন, দলীয় আনুগত্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনুদানের পরিমাণ সীমিত হলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের একজন সদস্যের এই পদক্ষেপ নির্বাচনের আগে প্রতীকী গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নির্বাচনে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

পুরুষ ভোটারদের সমর্থন হারাচ্ছেন ট্রাম্প, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের জোয়ার, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট তালারিকোর পাশে বুশ পরিবারের দুই সদস্য, চাপে ট্রাম্পপন্থী রিপাবলিকান শিবির



