সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
মার্কিন অবরোধে ইরানের তেলের ভাসমান মজুত নিঃশেষ, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তেহরানযুক্তরাষ্ট্রে ভুয়া জরিপের অজুহাতে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিতর্কে আইনি ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্নসৌদি আরবে হামলায় নিহত দুই, চার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাতের দাবি হুথিদেরসাজেকে গুলিবর্ষণ ও সড়ক অবরোধ, সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে ফিরলেন তিন হাজার পর্যটকট্রাম্পের সমর্থনে গভর্নর পদে অ্যান্ডি বিগস, চার অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের জয়ের ডাক

মার্কিন অবরোধে ইরানের তেলের ভাসমান মজুত নিঃশেষ, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তেহরান

মার্কিন নৌ অবরোধে ইরানের সমুদ্রে সংরক্ষিত তেলের মজুত নিঃশেষের দাবি, চীনে সরবরাহ ব্যাহত এবং রাজস্ব সংকটে বাড়ছে চাপ।

মার্কিন অবরোধে ইরানের তেলের ভাসমান মজুত নিঃশেষ, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তেহরান
মার্কিন অবরোধে ইরানের তেলের ভাসমান মজুত নিঃশেষ, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তেহরান

ইরানের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত ছায়া নৌবহরের জাহাজগুলোতে সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেলের মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে নতুন করে তেল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ায় তেহরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ছে। তবে মজুত শেষ হওয়ার খবরকে ইরানের সব তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা দেশটির হাতে আর কোনো তেল নেই এমন অর্থে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে অবস্থানরত ট্যাংকারে সংরক্ষিত ছিল। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনের ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই ভাসমান মজুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সমুদ্রপথে তেল স্থানান্তর, জাহাজ বদল এবং জটিল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। জাহাজ চলাচল ও তেলের মজুত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য উদ্ধৃত করে আগের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জুলাইয়ের মাঝামাঝি অবরোধ কার্যকর হওয়ার সময় অবরোধের বাইরে থাকা ইরানি তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তা কমে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। তখনকার পূর্বাভাস ছিল, সরবরাহের গতি অপরিবর্তিত থাকলে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

২২ অক্টোবর প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই ভাসমান মজুত এখন নিঃশেষ হয়েছে। ফলে আগে থেকে সমুদ্রের বাইরে অবস্থানরত তেল বিক্রি করে যে আয় করা সম্ভব হচ্ছিল, সেই সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট দিনে মজুত সম্পূর্ণ শূন্য হওয়ার হিসাবটি কেপলারের বিশ্লেষণ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি ট্যাংকারের প্রকৃত মজুত এবং সব বিক্রয় চুক্তির অর্থপ্রাপ্তি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই দাবিটিকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণ হিসেবে দেখা উচিত, সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত পরিসংখ্যান হিসেবে নয়।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগেই বলেছিলেন, ইরানের চীনে পাঠানোর জন্য অবশিষ্ট তেলের পরিমাণ দ্রুত কমছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে দেশটির হাতে বিক্রির জন্য আর তেল নাও থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভাসমান মজুত শেষ হওয়ার খবর তাঁর পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পূর্বাভাসের সঙ্গে পরবর্তী ঘটনার মিল থাকলেও, শুধু এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ১৬ অক্টোবরের বক্তব্যে দাবি করেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান অন্তত ২৫০০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারেনি। এই অঙ্কটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব। এটি ইরানের সরাসরি নগদ ক্ষতি, বাজেট ঘাটতি কিংবা বাজেয়াপ্ত সম্পদের সমপরিমাণ নয়; বরং রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে সম্ভাব্য তেল আয়ের যে পরিমাণ আটকে গেছে, তার মূল্যায়ন।

ইরানের অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশটির সরকারি আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ তেল খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তেল রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা না এলে সরকারকে আমদানি ব্যয়, সরকারি বেতন, ভর্তুকি এবং সামরিক ব্যয়ের মধ্যে কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তেল উৎপাদন কমানোর চাপও তৈরি হতে পারে, কারণ সংরক্ষণাগার ও জাহাজে তেল জমে থাকলেও ক্রেতার কাছে পৌঁছানো না গেলে তাৎক্ষণিক আয় নিশ্চিত হয় না।

ইরানের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে জুলাই থেকে দেশটির মুদ্রার মূল্য এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ার দাবিটির সময়সীমা, বিনিময় হারের ধরন এবং নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি নির্ধারিত হার ও খোলাবাজারের হারের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় শুধু একটি হার দিয়ে পুরো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

অন্যদিকে, ইরানের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হলেও বিকল্প সরবরাহকারীর কাছ থেকে তেল কেনার সুযোগ চীনা শোধনাগারগুলোর রয়েছে। সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলের মতো বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানো হলে ইরানের বাজার হারানোর প্রভাব চীনের ওপর কিছুটা কমতে পারে। তবে ইরানি তেলের পরিবর্তে অন্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহের খরচ, পরিবহনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতি ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

মার্কিন অবরোধের প্রভাব কেবল তেল বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল সম্পদের ওপরও চাপ বাড়ানো হয়েছে। ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ আটকে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অর্থায়ন সীমিত করা বলে ওয়াশিংটন দাবি করছে।

তবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেই ইরান দ্রুত রাজনৈতিক বা সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ফলে দেশটির সরকার ও সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যয় বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানের সমুদ্রে সংরক্ষিত তেলের মজুত নিঃশেষ হওয়ার খবর দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় চাপের ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে ওয়াশিংটনের দাবি এবং তেলের মজুত বিশ্লেষণ পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ইরানের সামগ্রিক তেল উৎপাদন, বিকল্প পথে রপ্তানি, চীনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এবং অবরোধের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফল মূল্যায়ন না করে একে চূড়ান্ত বিজয় বা ইরানের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক পতন বলা হবে অতিরঞ্জন।


ট্যাগ: ইরানইরানের_তেলমার্কিন_অবরোধতেল_রপ্তানি

প্রতিবেদক

CSB News USA

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।