ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুঁশিয়ারি, ট্রাম্পকে পাশে চান নেতানিয়াহ
৮,৬৫৫ বার পড়া হয়েছে ৫ মিনিটে পড়ুন
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ইরানকে ঘিরে অসমাপ্ত লক্ষ্য পূরণের কথাও বলেছেন তিনি। সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুই নেতার অবস্থান থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে চাপ অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন করে যৌথ হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগে দেওয়া ওই সমর্থনবার্তায় তিনি ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তেহরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই অভিযান শেষ করার পদক্ষেপ নিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক সমর্থনও প্রকাশ পায়। এর পরদিন, ১৯ অক্টোবর, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁদের আরও কাজ বাকি রয়েছে এবং দুই দেশ একসঙ্গে সেই কাজ সম্পন্ন করবে। ট্রাম্পও নেতানিয়াহুকে তাঁর পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। দুই নেতার কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, ইরানকে ঘিরে তাঁদের সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ রয়েছে। তবে এই বক্তব্যকে নতুন হামলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। তিনি শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার কথা বলছেন না; বরং ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনকে ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছেন। ২০ অক্টোবর উত্তর ইসরায়েলের কিরিয়াত শমোনার কাছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে দেওয়াই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব ক্ষমতায় থাকলে দেশটি আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারে। নেতানিয়াহুর এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে কতটা পুরোপুরি মেলে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব উভয়েই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার কথা বললেও সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নেতানিয়াহু ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন চান, অন্যদিকে ট্রাম্প সামরিক চাপের পাশাপাশি এমন একটি সমঝোতা অর্জন করতে চাইতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে। ফলে দুই নেতার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তাঁদের চূড়ান্ত কৌশল সব ক্ষেত্রে এক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর অবস্থান আরও কঠোর হয়ে ওঠার বিষয়টি উঠে এসেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান আবারও বিপজ্জনক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এ কারণে দেশটির সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছাড়া ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে ইসরায়েলের অভিযোগ এবং তার স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। এই পরিস্থিতিতে ইরানও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকির জবাব দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ১৯ অক্টোবর সতর্ক করে বলেন, আবার হামলা চালানো হলে তেহরানও পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি আগের সংঘাতের পর ইরান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলেও দাবি করেন। ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও বলেছেন, নতুন করে আক্রমণ হলে তার জবাব আগের তুলনায় আরও কঠোর হতে পারে। এসব বক্তব্যের কারণে নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লেও পাল্টাপাল্টি হুমকি মানেই যে অবিলম্বে যুদ্ধ শুরু হবে, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক জলপথে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির দাম প্রভাবিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি এই জলপথ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকার কথাও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা চলছে। ১৯ অক্টোবর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আকস্মিক সফরে ইসরায়েলে যান এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরানকে ঘিরে হুমকি এবং দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এই সফর দুই দেশের নিরাপত্তা যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরলেও বৈঠকের ভিত্তিতে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে। ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প তাঁর সমর্থনবার্তায় নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী নেতা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রশ্নটি নির্বাচনী বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে নেতানিয়াহুর ইরানসংক্রান্ত বক্তব্যকে শুধু সামরিক নীতির আলোকে নয়, নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে। তবে দুই নেতার বক্তব্যের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা রয়েছে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করার কথা বললেও কখন, কীভাবে এবং কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। একইভাবে নেতানিয়াহু ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনকে লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করলেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পূর্ণাঙ্গ সামরিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। তাই তাঁদের কঠোর বক্তব্যকে সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত, কিন্তু নতুন হামলা নিশ্চিত বলে প্রচার করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা হলে তার প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়লে আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথ এবং আশপাশের দেশগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাল্টাপাল্টি হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে বেসামরিক মানুষের জীবন, চিকিৎসাসেবা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে তাই সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।