ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ, প্যারিসে সংঘর্ষ-লুটপাট, গ্রেপ্তার ২৭২
জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর ২৭২ জনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার, ১৭ অক্টোবরের এই আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবিতে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও পেনশন নিয়ে অসন্তোষ এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে উদ্বেগ। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদে রূপ নেয়।
প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে আতশবাজি ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে এবং রাস্তায় আগুন জ্বালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নিরাপত্তার কারণে কিছু দোকান বন্ধ রাখা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়।
প্যারিসের বাইরেও লিয়ঁ, মার্সেই, তুলুজ ও অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ এবং সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীদের একটি দল শহরের পৌর ভবনে প্রবেশ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে সরকারি স্থাপনা ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। তবে সব বিক্ষোভকারী সহিংসতায় অংশ নেননি; অনেকেই শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন।
আন্দোলনের সঙ্গে ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বিক্ষোভের মিল দেখা যাচ্ছে। সে সময় জ্বালানির দাম ও করের চাপ নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ফ্রান্সের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। এবারের বিক্ষোভেও সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানো, বেতন ও পেনশন বাড়ানো এবং শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি পরিষেবার উন্নতির দাবি গুরুত্ব পেয়েছে। দেশটির বড় শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ফ্রান্সের সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনসাধারণের অসন্তোষের কারণগুলো মোকাবিলা করা এবং একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভের আগে শান্ত থাকার এবং মানুষের জীবন ও সম্পত্তির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও জনসেবার সমস্যাগুলো সমাধানে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পুলিশের শক্তি প্রয়োগ নিয়েও বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের কারণে কয়েকজন তরুণ গুরুতর আহত হওয়ার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। বিশেষ করে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত হারানোর ঘটনার পর পুলিশি অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে এক ধরনের বিস্ফোরক স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলেন। এ বিষয়ে তদন্ত ও পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
শনিবারের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরলেও, আন্দোলনকারীদের সব দাবির সমাধান হয়েছে—এমন কোনো তথ্য নেই। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, শ্রমিক সংগঠনগুলোর অবস্থান এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন দিকে এগোয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের এই বিক্ষোভ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে চলমান আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্ত, আলোচনার অগ্রগতি এবং রাজপথের পরিস্থিতির ওপর।





