ব্রিকস সম্মেলনে তারেকের অনুপস্থিতিকে ‘অপরিণত’ বললেন শেখ হাসিনা, উঠল কূটনৈতিক প্রশ্ন
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণত’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
হাসিনার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিরোধ, আবেগ কিংবা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাবের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তাঁর মতে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ভারত আয়োজিত এই সম্মেলনে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্যরাষ্ট্র না হলেও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের সহযোগিতামূলক জোট বিমসটেকের বর্তমান সভাপতির দায়িত্বে থাকায় তারেক রহমানকে সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত।
তবে শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান সম্মেলনে যোগ দেননি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কোনো সরকারি প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি বলে সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় ঢাকার বক্তব্য ছিল, আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে নয়, বরং বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সরকার আমন্ত্রণের এই পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়েছিল।
হাসিনা এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিক ধরন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বাংলাদেশের উচিত ছিল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ কাজে লাগানো। তিনি মনে করেন, ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত।
সাক্ষাৎকারে হাসিনা অতীতের একটি উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে দিল্লি সফর করেছিলেন, তখন তিনিও দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। আবার ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান লন্ডন সফর করার সময় তিনিও সেখানে ছিলেন। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি জিয়াউর রহমানের সফরে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সেই উদাহরণ তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে তাঁর দিল্লিতে অবস্থান কেন তারেক রহমানের ভারত সফরের ক্ষেত্রে বাধা হবে?
হাসিনার এই বক্তব্যের পেছনে বাংলাদেশ ও ভারতের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম হয়েছে এবং তাঁর প্রত্যর্পণের দাবিও জানিয়েছে ঢাকা। ফলে তাঁর ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানের সরকার ভারত সফরের ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ, পারস্পরিক সম্মান এবং সুস্পষ্ট আলোচ্যসূচির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকর্তারা আগেই জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সফর ও আলোচনা হতে পারে, তবে তার জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া জরুরি। অর্থাৎ, সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেবল হাসিনার উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে ঢাকার ঘোষিত কূটনৈতিক অবস্থানের অন্যান্য দিক আড়ালে থেকে যেতে পারে।
হাসিনা আরও বলেছেন, তাঁর সরকারের সময় ভারতসহ চীন, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষার অর্থ অন্য দেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করা নয়। বাংলাদেশের উচিত ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বিস্তৃত হয়।
তবে হাসিনার সমালোচনা তাঁর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকেও এসেছে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নীতির সমালোচক এবং তাঁর বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সরকারি সিদ্ধান্তের সমতুল্য মনে করা যায় না। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিলে বাংলাদেশ ঠিক কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা পেত, তা নিশ্চিতভাবে পরিমাপ করার মতো প্রমাণও প্রকাশিত হয়নি। সম্মেলনে অংশগ্রহণ সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তাতে নির্দিষ্ট বিনিয়োগ বা বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সরকারের অবস্থান মূল্যায়ন করতে হলে আমন্ত্রণের প্রকৃতি, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর যথার্থতা নির্ধারণে সরকারের যুক্তি, সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি এবং বিকল্প কূটনৈতিক পথ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিদ্যমান মতপার্থক্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে হাসিনা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন, অন্যদিকে ঢাকা আমন্ত্রণের ধরন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে কীভাবে জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক মর্যাদা বজায় রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া যায়।





