নিউইয়র্কের পাতাল রেলে ছুরিকাঘাত, আতঙ্কে যাত্রীরা—মুখোশধারী হামলাকারীর খোঁজে পুলিশ
ম্যানহাটনের অ্যাস্টর প্লেস স্টেশনে ভোররাতে ছুরিকাঘাতে আহত চল্লিশ বছর বয়সী ব্যক্তি হাসপাতালে স্থিতিশীল; মুখোশধারী সন্দেহভাজনকে খুঁজছে নিউইয়র্ক পুলিশ, তদন্ত চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের ম্যানহাটনে পাতালরেলের ভেতরে তর্কবিতর্কের জেরে এক যাত্রীকে একাধিকবার ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ভোররাতে উত্তরমুখী ছয় নম্বর রেলগাড়িতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তির বয়স ৪০ বছর। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানান। অন্যদিকে, মুখোশ পরা এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পেছনের কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে রাত আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে। উত্তরমুখী ছয় নম্বর রেলগাড়িটি ইস্ট ভিলেজ এলাকার অ্যাস্টর প্লেস স্টেশনে পৌঁছানোর পর আহত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। স্টেশনটি লাফায়েট স্ট্রিটের কাছে অবস্থিত। পুলিশ জানিয়েছে, হামলার আগে ওই ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজনের কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। সেই বিরোধ কী নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা ঘটনার আগের পরিস্থিতি, দুই ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক এবং হামলার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করছেন।
আহত ব্যক্তির শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা তাঁকে দ্রুত বেলভিউ হাসপাতালে নিয়ে যান। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। তবে তিনি কতটা গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, তাঁর চিকিৎসা কত দিন চলবে কিংবা পরবর্তী সময়ে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আহত ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তি মুখে কালো রঙের স্কি-মুখোশ পরেছিলেন। হামলার পর তিনি স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যান। সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। তবে সন্দেহভাজনের পরিচয়, পালিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ কিংবা তাঁর সঙ্গে আহত ব্যক্তির পূর্বপরিচয় ছিল কি না, সে সম্পর্কে পুলিশ প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানায়নি। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অযাচাইকৃত ছবি বা পরিচয়কে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাতালরেলের যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাতে যাঁরা কাজের জন্য যাতায়াত করেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন যাত্রী বলেছেন, পাতালরেলে চলাচলের সময় চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে পুরো পাতালরেল ব্যবস্থা সব সময় বিপজ্জনক এমন সিদ্ধান্ত টানা যথাযথ নয়। যাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, অপরাধের পরিসংখ্যান এবং পুলিশের তদন্তের ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিউইয়র্কের পাতালরেলে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত স্পেকট্রাম নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাতালরেল ব্যবস্থায় সামগ্রিক প্রধান অপরাধ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এক শতাংশেরও কম বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে মারাত্মক শারীরিক হামলার ঘটনা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহামারির বছরগুলো বাদ দিলে গত ১৫ বছরের মধ্যে চলতি বছর পাতালরেল ব্যবস্থার জন্য দ্বিতীয় নিরাপদ বছর হওয়ার অবস্থানে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সামগ্রিক অপরাধের প্রবণতা এবং নির্দিষ্ট ধরনের হামলার প্রবণতা এক রকম নাও হতে পারে।
একই দিনে ব্রঙ্কসের ১০৮তম স্ট্রিট স্টেশনেও ছুরিকাঘাতের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সেখানে উত্তরমুখী দুই নম্বর রেলগাড়িতে ২৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি আহত হন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ধড়ে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং তাঁকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুটি ঘটনা একই দিনে ঘটায় যাত্রীদের উদ্বেগ বেড়েছে। তবে এই দুই হামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে, একই ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কিংবা একই উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাগুলোকে একই অপরাধচক্রের অংশ বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হবে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাধারণত পাতালরেলে নজরদারি, দ্রুত জরুরি সহায়তা, পুলিশের উপস্থিতি এবং যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে আসে। এই ঘটনার তদন্তে রেলগাড়ির ভেতরের নজরদারি ক্যামেরা ও স্টেশনের ক্যামেরার ফুটেজ সহায়ক হতে পারে। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটেজ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সূত্র পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেনি। তাই ক্যামেরার মাধ্যমে সন্দেহভাজন শনাক্ত হয়ে গেছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তদন্তকারীরা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সম্ভাব্য আলামত এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
নিউইয়র্ক পুলিশ জনসাধারণের কাছে এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা জানাতে আহ্বান জানায়। এই ঘটনার বিষয়ে কারও কাছে প্রত্যক্ষ তথ্য থাকলে তিনি পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত তথ্যকেন্দ্রে ৮০০-৫৭৭-টিপস নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা তাদের সরকারি তথ্য জমা দেওয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য দিতে পারেন। জরুরি বিপদের ক্ষেত্রে স্থানীয় জরুরি সেবায় যোগাযোগ করা উচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনুমানভিত্তিক অভিযোগ না ছড়িয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য দেওয়াই তদন্তে সহায়তা করতে পারে।
অ্যাস্টর প্লেস স্টেশনের কাছে ছুরিকাঘাতের ঘটনাটি নিউইয়র্কের পাতালরেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। আহত ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থিতিশীল ছিলেন বলে সর্বশেষ প্রতিবেদন জানিয়েছে। কিন্তু হামলার কারণ, সন্দেহভাজনের পরিচয় এবং গ্রেপ্তারের অগ্রগতি এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। যাত্রীদের জন্য সতর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার মূল্যায়ন করা উচিত।





