ব্রেকিং
হিজবুল্লাহর বিস্ফোরক ফেরত না দিতে লেবাননের প্রেসিডেন্টকে কড়া বার্তা দিলেন মার্কো রুবিওওরেগনের সিলভার রেইল স্কুলে বন্দুকধারীর তাণ্ডব, রক্তে ভিজলো শিশুদের কোমল শ্রেণিকক্ষট্রাম্পের নির্দেশ পেলেই ইরানে ভয়ংকর বোমা হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রেরআমেরিকায় কাজের অনুমতির নিয়মে বড় পরিবর্তন, বিপাকে গ্রিনকার্ডপ্রার্থী ও এইচ-ফোর ভিসাধারীরানিউইয়র্কে আইসিইর গুলিতে আহত অভিবাসী আদালতে, ঘাড়ে গুলি নিয়েই আটক থাকার অভিযোগ

সাগরে স্বামী হারিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠালেন মা, সৌদিতে মৃত্যু, মরদেহ ফেরানোর আকুতি

সাগরে স্বামী হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন মা, সেই ছেলেকে হারিয়ে এখন সৌদি আরব থেকে মরদেহ ফেরানোর অপেক্ষায় তিনি।

সাগরে স্বামী হারিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠালেন মা, সৌদিতে মৃত্যু, মরদেহ ফেরানোর আকুতি
সাগরে স্বামী হারিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠালেন মা, সৌদিতে মৃত্যু, মরদেহ ফেরানোর আকুতি

বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের ছাহেরা বেগমের জীবনে শোক যেন বারবার ফিরে এসেছে। বহু বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন তাঁর স্বামী জালাল মিয়া। তখন তাঁদের একমাত্র সন্তান হানিফের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। স্বামীকে হারানোর পর সেই সন্তানকে ঘিরেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ছেলেকেও হারিয়েছেন বিদেশের মাটিতে। এখন তাঁর একটাই আকুতি, মৃত্যুর পর অন্তত একবার যেন ছেলের মুখটি দেখতে পারেন।

আরটিভি অনলাইনের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৬ বছর বয়সী হানিফের মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে। গত ৩ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছায়। তবে কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা পরিবারের সদস্যরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি। অন্যদিকে, বৈধ কাগজপত্রের জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই শোকে ভেঙে পড়েছেন ছাহেরা বেগম। যে সন্তানকে আগলে রেখে এতগুলো বছর কাটিয়েছেন, যার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছেন, সেই সন্তান আর কোনো দিন বাড়ি ফিরবে না—এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

পরিবারের জন্য হানিফ শুধু একজন সন্তান ছিলেন না, ছিলেন দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর জীবনের সব আশা-ভরসা গিয়ে পড়েছিল ছেলেকে ঘিরে। সেই ছেলেকে সমুদ্রের অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিদেশে পাঠিয়েও শেষ পর্যন্ত সন্তানকে হারানোর বেদনা থেকে রেহাই পেলেন না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই বছর আগে ধারদেনা করে হানিফকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা সহজ ছিল না। তবু ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিচিতজন ও বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা ধার করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
তাঁদের আশা ছিল, বিদেশে কাজ করে হানিফ পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন। মায়ের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে, সংসারের অভাব কমবে এবং নিজের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার পরও হানিফের জীবনে স্বস্তি আসেনি। বরং নতুন করে শুরু হয় কাগজপত্রের জটিলতা ও আর্থিক চাপ।
হানিফ সৌদি আরবের একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে যাওয়ার পর ভিসাসংক্রান্ত সমস্যার কারণে প্রায় দুই বছর তাঁকে অনিয়মিত অবস্থায় থাকতে হয়। বিদেশে কাজ করার সুযোগ পেলেও বৈধ কাগজপত্রের অনিশ্চয়তা তাঁর জীবনকে কঠিন করে তোলে।

পরিবারের আশা ছিল, কোনোভাবে কাগজপত্রের সমস্যার সমাধান হলে হানিফ নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। সেই আশায় মৃত্যুর প্রায় পাঁচ মাস আগে আবারও অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেন তিনি। আরটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয়টি বেসরকারি সংস্থা ও একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও চার লাখ ৫০ হাজার টাকা দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ভিসা বৈধ করার ব্যবস্থা করা।

এভাবে বিদেশযাত্রা ও কাগজপত্রের সমস্যা সমাধানের জন্য পরিবারের ওপর মোট প্রায় ১০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা তৈরি হয়। যে বিদেশযাত্রাকে ঘিরে পরিবারের সদস্যরা ভালো থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের আরও গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

হানিফের মৃত্যুর পর সেই ঋণ এখন পরিবারের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সংসার চালানো ও ঋণ পরিশোধের চাপ—সব মিলিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তাঁর মা ও স্ত্রী।

হানিফের স্ত্রী কাজল আক্তারও এখন কঠিন সময় পার করছেন। তাঁদের সংসারে রয়েছে ১১ বছর বয়সী ছেলে মো. জেনায়েদ ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মোসা. ছামিরা। বাবাকে হারিয়ে এই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে মানুষটি তাঁদের ভরণপোষণ ও ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে কাজ করতেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসারের দায়িত্ব সামলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কাজল আক্তারের জন্য স্বামীর মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই সন্তানকে বড় করে তোলার দায়িত্ব, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং ঋণের বোঝা। স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল সংসারে হঠাৎ এমন বিপর্যয় নেমে আসায় কীভাবে সামনের দিনগুলো কাটাবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা। তাঁর মা ছাহেরা বেগম জীবিত অবস্থায় স্বামীর মরদেহ পাননি। দীর্ঘদিন আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া জালাল মিয়ার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই পুরোনো শোকের ক্ষত বুকে নিয়েই তিনি ছেলেকে বড় করেছেন। এবার ছেলের মৃত্যুর পর অন্তত শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

কিন্তু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ নয়। বিদেশে মৃত্যুর পর কোনো প্রবাসীর মরদেহ দেশে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতা, মৃত্যুসংক্রান্ত নথি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মৃত ব্যক্তির কাগজপত্রে জটিলতা থাকলে প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন হতে পারে। হানিফের ক্ষেত্রেও বৈধ কাগজপত্রের সমস্যা ও পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার আরটিভি অনলাইনকে জানান, হানিফের মৃত্যুর খবর পরিবার তাঁকে জানিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চুও হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন।
তবে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে মরদেহ দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণও পরিবারের অজানা বলে জানানো হয়েছে। তাই এ মুহূর্তে হানিফের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে মরদেহ ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলেও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

এই পরিবারের ঘটনা প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপদ অভিবাসন, বৈধ কাগজপত্র এবং বিদেশে বিপদে পড়লে সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিদেশে কাজের আশায় অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে অর্থ জোগাড় করে। কিন্তু প্রতারণা, ভিসার জটিলতা বা কর্মপরিবেশের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তাঁদের সামনে বিকল্প পথ সীমিত হয়ে পড়ে।

হানিফের পরিবারের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার আলোকে দালালের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন, কাজের অনুমতি এবং ভিসার বৈধতা যাচাইয়ের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়। তবে হানিফের ক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে কাগজপত্রের সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই দালালের ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।

বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দূতাবাস ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত সহায়তা পরিবারটির দুর্ভোগ কমাতে পারে।

ছাহেরা বেগমের জন্য অবশ্য এসব আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখার আকুতি। স্বামীকে হারানোর পর যে সন্তানকে ঘিরে তাঁর জীবনের সব আশা গড়ে উঠেছিল, সেই সন্তানও এখন দূরদেশে চিরবিদায় নিয়েছে। তাঁর অপেক্ষা এখন কেবল মরদেহ ফিরে পাওয়ার।

অন্যদিকে, কাজল আক্তার ও তাঁর দুই সন্তানকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে, যেখানে শোকের পাশাপাশি রয়েছে সংসার চালানো এবং ঋণের চাপ সামলানোর কঠিন দায়িত্ব। পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে শিশু দুটির শিক্ষা, নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় স্বামীকে হারিয়ে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্নে দিন কাটিয়েছিলেন ছাহেরা বেগম। সমুদ্রের ভয় থেকে দূরে রাখতে ঋণ করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বিদেশে। কিন্তু সেই বিদেশেই ছেলের মৃত্যু তাঁর জীবনে নতুন করে শোকের অধ্যায় তৈরি করেছে। এখন আর কোনো স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষা নয়, মায়ের শেষ আকুতি—একবার যেন ছেলের মুখটি দেখতে পান, নিজের সন্তানকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পান।

যে সন্তানকে ঘিরে তাঁর এত দিনের বেঁচে থাকা, সেই সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এখন পরিবারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা জরুরি। ছাহেরা বেগমের অপেক্ষার অবসান হবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগের ওপর।


ট্যাগ: ছাহেরা বেগমহানিফবরগুনাতালতলীসৌদি আরবপ্রবাসী শ্রমিকপ্রবাসীর মৃত্যুমরদেহ দেশে ফেরানোঋণের বোঝানিরাপদ অভিবাসন

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।