পুতিনের বার্তা, ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও সহযোগিতা চায় রাশিয়া
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চান পুতিন, তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ও নিরাপত্তা বিরোধ নিয়ে মস্কো ও পশ্চিমের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপ কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব নেই মস্কোর। বরং ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী রাশিয়া। তাঁর এই বক্তব্য ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বক্তব্যটিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিশ্চিত অগ্রগতি হিসেবে দেখার আগে ইউক্রেন যুদ্ধ, সামরিক নিরাপত্তা এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
রাশিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মস্কোর ক্রেমলিনে সামরিক-শিল্প কমিশনের এক বৈঠকে পুতিন এসব কথা বলেন। পরদিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটির মূল বিষয়বস্তুর সত্যতা নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত করা যায়।
পুতিন বলেন, ইউরোপ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং এ ধরনের পদক্ষেপের কোনো কারণও মস্কোর কাছে নেই। তিনি ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতির কথা জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হওয়া উচিত।
তবে তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। একই বৈঠকে পুতিন কয়েকজন ইউরোপীয় নেতার সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব নেতা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কাকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার হুমকির বিষয়টি ব্যবহার করে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসব অভিযোগ পুতিনের নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন। ইউরোপীয় দেশগুলো কেন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কেবল রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে দেওয়া যায় না। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও এই পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরু হওয়ার পর মস্কো ও ইউরোপের বহু দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তার সদস্যদেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে আর্থিক, মানবিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। রাশিয়া এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করে আসছে।
এই পরিস্থিতিতে পুতিনের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি কোনো নতুন শান্তিচুক্তি, যুদ্ধবিরতি কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা নয়। তাঁর বক্তব্যে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
বাল্টিক সাগরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক মহড়া নিয়েও পুতিন উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক কয়েকটি মহড়ার একটি উদ্দেশ্য ছিল বেসামরিক জাহাজ আটক করার অনুশীলন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার কথা বলার পাশাপাশি বেসামরিক জাহাজ আটক করার প্রস্তুতি নেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য। প্রয়োজন হলে রাশিয়াও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তবে সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বক্তব্য এবং মহড়ার আনুষ্ঠানিক বিবরণও যাচাই করা প্রয়োজন।
বৈঠকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা। পুতিন নতুন রাষ্ট্রীয় অস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি পারমাণবিক অস্ত্রবাহিনীর সক্ষমতা জোরদার করাকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, চালকবিহীন ব্যবস্থা, নির্ভুল আঘাত হানার অস্ত্র এবং কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর যোগাযোগ ও নজরদারি সক্ষমতা উন্নয়নের কথাও বলেন।
এখানেই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে তিনি ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা ও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের কথা বলছেন, অন্যদিকে রাশিয়ার সামরিক প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। অবশ্য কোনো দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করার ঘোষণা একাই আসন্ন যুদ্ধের প্রমাণ নয়। তবে বিদ্যমান উত্তেজনার মধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা-উদ্বেগকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড এবং সাইবার হামলা, নাশকতা ও চালকবিহীন আকাশযানসংক্রান্ত বিভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মস্কো এসব অভিযোগের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান করে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
পুতিনের বক্তব্যের বাস্তব তাৎপর্য নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালু করা, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কার্যকর আলোচনা, নিরাপত্তা নিয়ে পারস্পরিক উদ্বেগের সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি না হলে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ঘোষণা বাস্তবে কতটা ফল দেবে, তা বলা কঠিন।
পুতিনের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো ইউরোপের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার সম্ভাবনা খোলা রাখা। তবে এটিকে রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনা শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না। বক্তব্যটির মূল অংশ সত্য হলেও এর অর্থ শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা নয়। বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে হলে বক্তব্যের পাশাপাশি উভয় পক্ষের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।





