যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা, যুদ্ধের আশঙ্কা অবশ্য ক্ষীণ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে কানাডা, তবে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা এখনো অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতাপূর্ণ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিচ্ছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় এমন একটি সম্ভাবনাও সরকারের বিবেচনায় রাখতে হয়েছে, যা একসময় প্রায় অকল্পনীয় বলে মনে করা হতো। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই ধরনের হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত কম। পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার অর্থ যুদ্ধ আসন্ন এমন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বের অংশ হিসেবে সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনা করা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের একান্নতম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার বিষয়ে তাঁর বারবার করা মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও প্রতিরক্ষা সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বক্তব্য অটোয়ার নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে কানাডার সামরিক পরিকল্পনায় সম্ভাব্য সংঘাতের মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় এসেছে।
মার্কিন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কার্নি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, কোনো বিপদের সম্ভাবনা কম হলেও সরকারকে তার পরিণতি সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে হয়। জাতীয় নিরাপত্তার পরিকল্পনায় সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়, যাতে অপ্রত্যাশিত সংকট দেখা দিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তবে কানাডা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন আক্রমণের কোনো নিশ্চিত সতর্কবার্তা পেয়েছে, এমন তথ্য বিবিসির প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কানাডায় সামরিক হামলার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করে জানিয়েছে, তিনি কানাডার জনগণের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে তাদের বিশ্বাস। এর আগে ২০২৫ সালে ট্রাম্পও কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত কম বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে উদ্বেগ বাড়লেও দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা বাস্তবতার বিচারে অত্যন্ত কম। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং উত্তর আমেরিকার আকাশসীমা সুরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করছে। উভয় দেশই উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের সদস্য। এই জোটের মূল নীতিগুলোর একটি হলো, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের সহায়তার ব্যবস্থা করা। যদিও এমন পরিস্থিতিতে জোটের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক ও সামরিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে, তবু দুই মিত্র দেশের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে।
কানাডার সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বিবিসিকে বলেছেন, তাঁর দীর্ঘ সামরিক কর্মজীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডায় সামরিক হামলার আশঙ্কাকে প্রচলিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এবং পারস্পরিক নির্ভরতা এমন সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের প্রচলিত নিরাপত্তা ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন তৈরি করেছে।
তবে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে শুধু স্থলপথে সেনা প্রবেশের বিষয়টিই বিবেচ্য নয়। সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক চাপও একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিবিসির প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এসব অপ্রচলিত ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন এবং সরকারি তথ্যব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কানাডার সামরিক সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশটির ভৌগোলিক আয়তন বিশাল হলেও জনসংখ্যা ও সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে কানাডার সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তবে সামরিক পরিকল্পনায় কোনো সম্ভাব্য আক্রমণ দ্রুত অগ্রসর হতে পারে বলে ধারণা করা মানেই বাস্তবে সেই ঘটনা ঘটবে, এমন নয়।
কানাডার নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় মিত্রদেশগুলোর ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো মিত্রদের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ধরনের সহায়তা কীভাবে দেওয়া হবে, কোন পরিস্থিতিতে দেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো অনুমাননির্ভর। কোনো মিত্রদেশ সামরিক হস্তক্ষেপের নিশ্চয়তা দিয়েছে এমন দাবি করার মতো তথ্য নেই।
ঐতিহাসিকভাবেও কানাডার নিরাপত্তা ভাবনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা জটিল। দুই দেশ বর্তমানে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদার হলেও অতীতে তাদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে। আঠারো শতকের শেষভাগে এবং উনিশ শতকের শুরুতে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষ কানাডার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৮১২ সালের যুদ্ধেও মার্কিন বাহিনী তৎকালীন ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়েছিল। এসব ইতিহাস বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ব্যাখ্যা করে না, তবে কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনার পটভূমি বুঝতে সাহায্য করে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি এবং দুই দেশের উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন ও প্রতিরক্ষা খাত পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কম হলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিরোধ অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। শুল্ক আরোপ, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, কানাডার সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তিত আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ আসন্ন বা দুই দেশ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করা যথাযথ হবে না। কানাডার নেতৃত্বের বক্তব্য ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ঝুঁকিটি অত্যন্ত কম হলেও সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রস্তুত থাকা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আগামী দিনে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক আলোচনা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অগ্রগতি এই উদ্বেগ কতটা বাড়বে বা কমবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





