সান ফ্রান্সিসকো উপকূলে ১৬ ফুট ঢেউয়ের আশঙ্কা, উপকূলজুড়ে নতুন প্লাবন সতর্কতা জারি
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো উপকূলে ১৬ ফুট পর্যন্ত ঢেউয়ের আশঙ্কা, অস্বাভাবিক জোয়ারে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে সতর্ক কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার, বিপজ্জনক সামুদ্রিক ঢেউ এবং উপকূলীয় প্লাবনের আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ। ১১ অক্টোবর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কয়েকটি এলাকায় সর্বোচ্চ ১৬ ফুট পর্যন্ত ভাঙা ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিচু উপকূলীয় এলাকায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিক ভূমির উচ্চতার ওপর দেড় ফুট পর্যন্ত উঠে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সৈকত, উপকূলীয় পথ, পার্কিং এলাকা এবং নিচু সড়ক প্লাবিত হতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকো, উত্তর মন্টেরি উপসাগর, দক্ষিণ মন্টেরি উপসাগর এবং বিগ সুর উপকূলের কয়েকটি এলাকায় উপকূলীয় প্লাবনসংক্রান্ত সতর্কতা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর বিকেল ৩টা পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। অন্যদিকে সৈকতে বিপজ্জনক ঢেউ ও স্রোতের বিষয়ে সতর্কতা সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জারি রাখা হয়েছিল। সতর্কতার সময়সীমা স্থানীয় সময় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ এসব নির্দেশনা হালনাগাদ করতে পারে।
এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার এবং শক্তিশালী ঢেউয়ের সম্মিলিত প্রভাব। স্বাভাবিক জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি উপকূলের দিকে এগিয়ে আসে। কিন্তু জোয়ারের উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সমুদ্রের পানি সাধারণত শুকনো থাকা সৈকত, হাঁটার পথ ও সড়কের ওপর উঠে যেতে পারে। ঢেউয়ের শক্তি বেশি হলে পানি আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই চলাচলের পথ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
সান ফ্রান্সিসকোর উপকূলীয় পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্রিসি ফিল্ড এলাকার জোয়ার মাপার কেন্দ্রে অক্টোবর মাসের সর্বোচ্চ পানির উচ্চতার নতুন রেকর্ড হয়েছে। শুক্রবারের পর শনিবারও সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। শনিবার সেখানে পানির উচ্চতা স্বাভাবিক সর্বোচ্চ দৈনিক জোয়ারের তুলনায় ১ দশমিক ৭৩ ফুট বেশি রেকর্ড করা হয়। আগের দিনের রেকর্ড ছিল ১ দশমিক ৬২ ফুট। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে রেকর্ড করা হয়েছিল ১ দশমিক ৪ ফুট। এই পরিসংখ্যান উপকূলীয় পানির অস্বাভাবিক উচ্চতার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
উচ্চ জোয়ারের প্রভাব ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে। সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিল ভ্যালিতে একটি মহাসড়কের উত্তরমুখী প্রবেশপথ বন্ধ করতে হয়েছিল। টিবুরন এবং সান ফ্রান্সিসকোর ওশান বিচ এলাকায়ও পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত উঠে আসে। এসব স্থানে এমন পরিস্থিতি সাধারণত শীতকালীন শক্তিশালী ঝড়ের সময় বেশি দেখা যায়।
সৈকতে বিপদের আরেকটি বড় কারণ হলো আকস্মিক শক্তিশালী ঢেউ। সমুদ্রের ঢেউ কখনো কখনো আগের কয়েকটি ঢেউয়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি নিয়ে হঠাৎ তীরে আছড়ে পড়ে। এ ধরনের ঢেউ বালুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে কিংবা পাথর ও বাঁধের ওপর থাকা ব্যক্তিদের ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে ফেলে দিতে পারে। তাই শান্ত মনে হলেও সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া সমুদ্রে শক্তিশালী বিপরীতমুখী স্রোত বা তীর থেকে গভীর পানির দিকে টেনে নেওয়া স্রোত সাঁতারুদের জন্য মারাত্মক বিপদ তৈরি করতে পারে। এই স্রোতে পড়লে দক্ষ সাঁতারুরাও সহজে তীরে ফিরতে পারেন না। তাই আবহাওয়া কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিপজ্জনক সময়ে সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকা এবং সৈকতের সতর্কসংকেত মেনে চলা জরুরি।
ছোট নৌযান চালকদের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের সামুদ্রিক সতর্কবার্তায় কিছু উপকূলীয় জলসীমায় ঘণ্টায় ১০ থেকে ২০ নট গতির উত্তর দিকের বাতাস এবং সর্বোচ্চ ৩০ নটের ঝাপটার কথা বলা হয়েছে। এসব এলাকায় সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা ৮ থেকে ১১ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এ অবস্থায় ছোট নৌযানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অনভিজ্ঞ নৌযান চালকদের বিপজ্জনক জলসীমায় চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ সময়ের অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ারের সঙ্গে সমুদ্রের উষ্ণতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে। সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি এবং এল নিনো পরিস্থিতি পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। উষ্ণ পানি প্রসারিত হয়ে বেশি জায়গা দখল করে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্লাবনের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে; তাই সব ক্ষয়ক্ষতিকে একটি কারণের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
উপকূলীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ হলো, জেটি, পাথুরে বাঁধ, সমুদ্রের ধারের উঁচু কাঠামো এবং ঢেউ আছড়ে পড়ার স্থানের কাছাকাছি না যাওয়া। অজানা গভীরতার পানির ওপর দিয়ে গাড়ি চালানো এবং বন্ধ সড়কের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করাও বিপজ্জনক। যেসব এলাকায় নিয়মিত জোয়ারের পানি ঢোকে, সেখানকার বাসিন্দাদের স্থানীয় সতর্কবার্তা অনুসরণ করা উচিত।
সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার ও শক্তিশালী ঢেউয়ের কারণে উপকূলীয় প্লাবন এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কতা অনুযায়ী, বিপজ্জনক পরিস্থিতি সোমবার ও মঙ্গলবার পর্যন্ত কিছু এলাকায় অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সতর্কতার সময়সীমা ও ঝুঁকির মাত্রা এলাকাভেদে আলাদা। তাই উপকূলে যাওয়ার আগে সর্বশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জোয়ারের সময়সূচি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।





