রুশ ডিজেল আমদানির অনুমতি নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বৈধতা প্রশ্নে সাত মার্কিন সিনেটর
রাশিয়ার ডিজেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে, কংগ্রেসের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন সাত সিনেটর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের সাত মার্কিন সিনেটর। রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর আগে থেকে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে নতুন করে ডিজেল আনার উদ্যোগকে কংগ্রেসের নির্ধারিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন আইনপ্রণেতারা।
রোববার, ১১ অক্টোবর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে সিনেটররা বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ২০২২ সালে মার্কিন কংগ্রেস রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাঁদের বক্তব্য, রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন বন্ধ না করা পর্যন্ত দেশটি থেকে জ্বালানি কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আনা উচিত নয়।
বিবৃতিতে অংশ নেওয়া সাত সিনেটর হলেন ডেমোক্র্যাট দলের জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন এবং রিপাবলিকান দলের সুসান কলিন্স, লিসা মারকোস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্য হওয়ায় এই সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সিনেটরদের অভিযোগ, রুশ ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার আগে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করেনি। পাশাপাশি সিদ্ধান্তটির পক্ষে আইনি ব্যাখ্যা দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, প্রশাসন সেটিও যথাযথভাবে পালন করেনি বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা অবস্থায় নির্বাহী বিভাগের এমন পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
যৌথ বিবৃতিতে আইনপ্রণেতারা বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা অবস্থায় দেশটির সরকারের জন্য নতুন আর্থিক সুবিধা তৈরি করা উচিত নয়। তাঁদের আশঙ্কা, রুশ জ্বালানি কেনার সুযোগ তৈরি হলে সেই বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ মস্কোর অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে। তাই তাঁরা প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর রুশ ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে সমঝোতার কথা জানান। তাঁর ঘোষণায় বলা হয়, প্রথম পর্যায়ে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল বাজারে সরবরাহ করা হবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে জ্বালানির উচ্চমূল্য কমানো এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর কথা তুলে ধরেছে মার্কিন প্রশাসন।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং তেলের পরিবহনপথ ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়েছে। ডিজেল দেশটির কৃষি, পণ্য পরিবহন, ট্রাক চলাচল এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ফলে এর দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন তাই সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যচাপ কমানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি করলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়লেও পরিবহন, পরিশোধন, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং আঞ্চলিক চাহিদার কারণে এর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। সরবরাহের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পূরণ হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনি ক্ষমতার আওতায় থেকেই রুশ জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় প্রশাসন আইনসম্মত উপায় ব্যবহার করতে চায়। তবে প্রশাসনের এই অবস্থানের সঙ্গে সিনেটরদের অভিযোগের মৌলিক বিরোধ রয়েছে। এক পক্ষ মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্য পক্ষ নিষেধাজ্ঞার আইন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেননীতি ও মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র রুশ জ্বালানি আমদানি বন্ধের পদক্ষেপ নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করা। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিতর্কে রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত আইন অনুসরণ করছে কি না, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, প্রশাসন যদি আইনগত বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে, তাহলে বিষয়টি শুধু জ্বালানি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কংগ্রেস ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকেরা জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক সংকটের সময় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা হলে বাজারের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ বিভিন্ন পক্ষ রাশিয়ার সঙ্গে এই জ্বালানি সমঝোতার সমালোচনা করেছেন। তাঁদের উদ্বেগ, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য থেকে আয় বাড়লে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মস্কো অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। তবে এই সমঝোতার বাস্তব আর্থিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহের পরিমাণ, মূল্য, বাণিজ্যের শর্ত এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ওপর।
সাত সিনেটরের বিবৃতি প্রকাশের পর এখন নজর রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। প্রশাসন সিদ্ধান্ত বহাল রাখবে, নাকি কংগ্রেসের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে আইনি ব্যাখ্যা দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে রুশ ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম কতটা কমবে, সেটিও অনিশ্চিত।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নীতিগত বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। কংগ্রেসের আইনগত আপত্তি এবং প্রশাসনের জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ কীভাবে মীমাংসা হয়, তা আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।





