ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট চাইলেন ট্রাম্প, জেলেনস্কির সঙ্গে বিরোধে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা
রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তির পর ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প, পাল্টা প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তের অধিকার তুলে ধরেছে কিয়েভ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি ঘোষণার পর গত ১০ অক্টোবর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নতুন নেতা প্রয়োজন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে ইউক্রেনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ইউক্রেনের জনগণ ও দেশটির সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযোগ, জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার বিভিন্ন সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাননি। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্বের কারণে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইউক্রেনের রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য কেবল ইউক্রেনকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তেল সরবরাহে বাধা, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জেলেনস্কির প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, জেলেনস্কির প্রতি ইউক্রেনের জনগণের সমর্থন রয়েছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের অধিকার জনগণেরই। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বিদেশি কোনো নেতার মন্তব্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তন করা হবে না। দেশটির সরকার যুদ্ধের অবসান চাইলেও নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই বিরোধের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ডিজেল সরবরাহ চুক্তি। ট্রাম্প ৯ অক্টোবর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর জানান, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। তাঁর ঘোষণায় নভেম্বর মাসে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ঘোষিত পরিমাণের পুরোটা বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এই চুক্তিকে বাস্তবায়িত সরবরাহের পরিবর্তে ঘোষিত পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে এই উদ্যোগের কথা বলেছে। ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন শিল্পের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের আশা, রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল বাজারে এলে সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য শুধু সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না। চাহিদা, পরিবহনব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাতও দামের গতিপথ নির্ধারণ করে।
ইউক্রেনের সরকার এই চুক্তিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। জেলেনস্কির বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়লে দেশটি যুদ্ধ চালানোর জন্য আরও অর্থ পেতে পারে। সেই অর্থ অস্ত্র উৎপাদন, ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন আকাশযান এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে ব্যবহার করা সম্ভব। ইউক্রেনের আশঙ্কা, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমে গেলে যুদ্ধ বন্ধে মস্কোকে আলোচনায় আনতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা দুর্বল হতে পারে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি আয় দেশটির সামরিক ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে মূল বিরোধ হলো, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানির বাজারে স্বস্তি আনার চেষ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা সীমিত রাখার নীতির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রুশ হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবরও সামনে আসে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে তিনটি শিশু ছিল। এই ঘটনা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়কে আবারও সামনে এনেছে। তবে জ্বালানি চুক্তি এবং ওই হামলার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দাবি করার মতো স্বাধীন প্রমাণ নেই।
কূটনৈতিক পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ট্রাম্পের বক্তব্য এই আলোচনায় চাপ বাড়াতে পারে, তবে তা যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের নেতৃত্ব নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইউক্রেন ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ রাশিয়ার আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আগামী দিনে চুক্তির বাস্তবায়ন, নিষেধাজ্ঞার অবস্থা এবং যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এই বিরোধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





