রিয়াদের বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা, নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক, বন্ধ উড়োজাহাজ চলাচল

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে তৃতীয় হামলায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে, বন্ধ হয়েছে বিমান চলাচল।

রিয়াদের বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা, নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক, বন্ধ উড়োজাহাজ চলাচল
রিয়াদের বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা, নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক, বন্ধ উড়োজাহাজ চলাচল

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার, ১০ অক্টোবর, বিমানবন্দরে হামলার পর বহু মানুষ হতাহত হন এবং কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রথম দিকের প্রতিবেদনে কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের দুই নাগরিকও রয়েছেন।

ঘটনাটি শুধু সৌদি আরবের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বারবার হামলা হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তা, বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াত এবং আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবারের হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং স্থাপনাগুলো ব্যবহারের উপযোগী ও নিরাপদ কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে। প্রাথমিক বিবৃতিতে আহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছিল। পরে রয়টার্সের প্রতিবেদনে ৩০৯ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী আহত মানুষকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান। আহতদের উদ্ধারে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত বিমানবন্দরে পৌঁছায়। একজন আহত যাত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী, আকাশের ওপর দিয়ে কিছু একটা উড়ে যেতে দেখার পর একটি প্রস্থান ফটকের কাছে ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে। তবে এসব বর্ণনা থেকে হামলার প্রতিটি ধাপ কিংবা স্থাপনার সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

রয়টার্স জানিয়েছে, নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি আরবের নাগরিক, দুজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, হামলায় বিভিন্ন দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর খবর প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। তবে নিহত বাংলাদেশিদের নাম, বয়স, পেশা, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা তাঁরা সৌদি আরবে কী কাজে অবস্থান করছিলেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য ছাড়া কিছু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

এই হামলাটি চলতি সপ্তাহে রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও একই বিমানবন্দরে দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবারের দুটি হামলায় তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে দেশটির জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থার একজন চালকও ছিলেন। বিমানবন্দরের স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি মাটিতে থাকা একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগের আরেকটি হামলায় একজন সুদানি নাগরিক নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে ধারাবাহিক হামলা দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তাকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
হামলার জন্য ইয়েমেনভিত্তিক হুতি গোষ্ঠীকে দায়ী করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের হামলার দায়ও গোষ্ঠীটি স্বীকার করেছে। তবে হামলার নির্দিষ্ট সামরিক কৌশল, ব্যবহৃত অস্ত্রের পূর্ণ বিবরণ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা সম্পর্কে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই হামলার দায় স্বীকারের তথ্য এবং হামলার প্রতিটি কারিগরি বিবরণকে এক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এই সংঘাতের পেছনে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, হুতি গোষ্ঠী দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে জড়িত। অতীতে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত কমানোর চেষ্টা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে লড়াই আবার তীব্র হয়েছে। ইয়েমেনের কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরেও সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে এই প্রণালির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি আরবের সীমানার বাইরেও বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বহু উড়োজাহাজকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয় অথবা নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করা হয়। কুয়েত এয়ারওয়েজ, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন সংস্থার একাধিক যাত্রা বাতিল বা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ইউরোপের কয়েকটি বিমান সংস্থাও রিয়াদগামী যাত্রা স্থগিত বা সীমিত করে। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং আকাশপথে সামরিক তৎপরতার ঝুঁকি কাজ করেছে।
বিদেশি দূতাবাসগুলোও নাগরিকদের সতর্ক করেছে। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দেশটির নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরাও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থাও সৌদি আরবের আকাশসীমায় ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা সম্প্রসারণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের তৎপরতা, সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা এবং আকাশে ধ্বংসাবশেষ পড়ার আশঙ্কা বেসামরিক উড়োজাহাজের জন্য বিপদ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি আরবের পক্ষে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সম্ভাবনাটি বিবেচনা করার কথা জানান। তবে এই বক্তব্যকে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সৌদি আরব, ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে, হামলার পর বিমানবন্দর পুনরায় চালু করার আগে স্থাপনার নিরাপত্তা যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়ে। যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁদের নির্ধারিত উড়োজাহাজের যাত্রা চালু আছে কি না, সময় পরিবর্তন হয়েছে কি না এবং বিকল্প পথে যেতে হবে কি না। যাঁদের রিয়াদ হয়ে অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের বিমান সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি হালনাগাদ তথ্য নেওয়া উচিত। বিমানবন্দরের পুরোনো সময়সূচি দেখে যাত্রা শুরু করলে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদেরও নিজ নিজ নিয়োগকর্তা, বিমান সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো, রিয়াদে বড় আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার মধ্যেও আয়োজকেরা সম্মেলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এসব আয়োজনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ওপরও সংঘাতের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রাণহানি, বিপুলসংখ্যক আহত, আন্তর্জাতিক যাত্রা বাতিল এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর সতর্কতা—সবকিছুই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। তবে ভবিষ্যতে আরও হামলা হবে কি না, বিমান চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং সংঘাত কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


ট্যাগ: সৌদি আরবরিয়াদ বিমানবন্দরবিমানবন্দরে হামলাহুতি গোষ্ঠীবাংলাদেশি নিহতপ্রবাসী বাংলাদেশিমধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতআন্তর্জাতিক বিমান চলাচলক্ষেপণাস্ত্র হামলাবিমান নিরাপত্ত

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…