মাত্র ১৭ সেন্টের পণ্য কিনে ফেরত, অভিবাসন অভিযান ঠেকাতে ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিনব প্রতিবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মাত্র ১৭ সেন্টের পণ্য কিনে বারবার ফেরত দিয়ে দোকানের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর অভিনব প্রতিবাদে আলোচনায় এসেছেন অধিকারকর্মীরা।

মাত্র ১৭ সেন্টের পণ্য কিনে ফেরত, অভিবাসন অভিযান ঠেকাতে ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিনব প্রতিবাদ
মাত্র ১৭ সেন্টের পণ্য কিনে ফেরত, অভিবাসন অভিযান ঠেকাতে ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিনব প্রতিবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে মাত্র ১৭ সেন্টের একটি বরফ সরানোর যন্ত্র কিনে আবার ফেরত দেওয়ার অভিনব কর্মসূচি পালন করেছিলেন অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারকর্মীরা। দোকানের ক্রেতাসেবা কেন্দ্রে বারবার পণ্য ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সারি তৈরি করে কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন ঘটানোই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। ঘটনাটি বাস্তব হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটিকে নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করার আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জানা প্রয়োজন: বহুল আলোচিত এই কর্মসূচিটি হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার মনরোভিয়ায়। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একে নতুন করে সংঘটিত ঘটনা বলা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে জানায়, প্রায় এক শ মানুষ মনরোভিয়ার একটি নির্মাণসামগ্রীর দোকানে সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের অনেকে একটি করে বরফ সরানোর যন্ত্র কেনেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে সেটি ফেরত দেওয়ার জন্য আবার সারিতে দাঁড়ান। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা দোকানটির প্রাঙ্গণে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান বন্ধে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত সিবিএস লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রতিবেদনেও ১৭ সেন্টের পণ্য কেনা ও ফেরত দেওয়ার ঘটনাটি নিশ্চিত করা হয়।

প্রতিবাদকারীদের এই পদ্ধতির পেছনে ছিল একটি প্রতীকী বার্তা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অভিবাসী শ্রমিকেরা প্রতিদিন এই ধরনের দোকানের সামনে কাজের সন্ধানে আসেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। অথচ সেসব জায়গায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান চালানোর ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। তাই দোকান বর্জন না করে তাঁরা এমন একটি পদ্ধতি বেছে নেন, যাতে পণ্য কেনার মাধ্যমে দোকানের সঙ্গে লেনদেন বজায় রেখেও সাময়িকভাবে স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করা যায়।

কর্মসূচিটি সমন্বয় করেছিল অভিবাসী ও দিনমজুরদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় দিনমজুর সংগঠনের নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা চেয়েছিলেন, দোকান কর্তৃপক্ষ যেন তাদের প্রাঙ্গণে অভিবাসনবিষয়ক অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলে। বিক্ষোভকারীরা দোকানের ভেতরে মিছিল করেন, বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং কমলা রঙের বালতি ব্যবহার করে প্রতিবাদের পরিবেশ তৈরি করেন। তাঁদের মূল দাবি ছিল, অভিবাসী শ্রমিকেরা যেন কাজের সন্ধানে এসে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত না থাকেন।

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচির সময় দোকানের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াননি। পরে প্রবেশপথের একটি অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিবিএস লস অ্যাঞ্জেলেস জানায়, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কেনা ও ফেরত দেওয়ার এই কর্মসূচিতে দোকানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে দোকানটি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল। তাই দোকান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বিক্ষোভের পেছনে আরও একটি বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে কার্লোস রবার্তো মনতোয়া ভালদেস নামের এক দিনমজুর মনরোভিয়ার ওই এলাকার একটি অভিবাসন অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে মহাসড়কে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। তাঁর মৃত্যু স্থানীয় শ্রমিক ও অভিবাসী অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে সময় লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে জানিয়েছিল, ওই ব্যক্তিকে তাদের কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী দল ধাওয়া করছিল না। ফলে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে অভিযানের সম্পর্ক নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এই বিতর্কে দোকান কর্তৃপক্ষও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে বলা হয়েছিল, তারা অভিবাসন ও সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তাদের সঙ্গে অভিযান পরিচালনার সমন্বয় করে না এবং অভিযান শুরুর আগেও সাধারণত তাদের জানানো হয় না। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছিল, যেখানে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে, সেখানে প্রযোজ্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আইন মেনে চলতে হয়।

প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রকাশিত ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, তাদের দোকান ও গাড়ি রাখার জায়গায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম তারা পরিচালনা করে না কিংবা এ ধরনের অভিযান সমন্বয় করে না। তবে দোকান ও গাড়ি রাখার জায়গা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে সব সময় পরোয়ানা প্রয়োজন হয় না বলে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, গাড়ির নম্বর শনাক্ত করার প্রযুক্তি চুরি প্রতিরোধ ও নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা হয় এবং সেই তথ্য কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেওয়া হয় না।

এই বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিবাদকারীদের দাবির মূল পার্থক্যটি এখানেই। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা অভিযান পরিচালনা করে না এবং আগে থেকে জানতেও পারে না। অন্যদিকে অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, তাদের দোকান ও গাড়ি রাখার জায়গায় অভিযান চালানো হলে শ্রমিকেরা আতঙ্কিত হন; তাই প্রতিষ্ঠানটির উচিত প্রকাশ্যে এ ধরনের অভিযানের বিরোধিতা করা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া।

বিষয়টি ২০২৬ সালেও আলোচনার বাইরে চলে যায়নি। কিউইইডির ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে ক্যালিফোর্নিয়ার কনকর্ড শহরের একটি দোকানের বাইরে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে নতুন উদ্বেগের কথা উঠে আসে। অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেন, আগের দিন ওই এলাকার দোকানের গাড়ি রাখার জায়গা থেকে কয়েকজনকে অভিবাসন কর্মকর্তারা আটক করে নিয়ে গেছেন এবং তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রতিবাদকারীরা কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার দাবি জানান। তবে ওই ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন এবং কনকর্ডের ঘটনাকে ২০২৫ সালের মনরোভিয়ার পণ্য কেনা-ফেরত দেওয়ার কর্মসূচির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

সামগ্রিকভাবে, ১৭ সেন্টের পণ্য কিনে বারবার ফেরত দেওয়ার প্রতিবাদের ঘটনাটি বানানো নয়। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অধিকারকর্মীদের বক্তব্যে এর সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে এখনই ঘটছে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হবে, কারণ বহুল প্রচারিত নির্দিষ্ট কর্মসূচিটি ২০২৫ সালের নভেম্বরের। একই সঙ্গে দোকান কর্তৃপক্ষ অভিবাসন অভিযান পরিচালনায় সরাসরি জড়িত—এমন সিদ্ধান্তেও কেবল প্রতিবাদের দাবি থেকে পৌঁছানো যায় না; প্রতিষ্ঠানটি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তাই তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে সবচেয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসন অভিযানের প্রতিবাদে পণ্য কিনে ফেরত দেওয়ার অভিনব কর্মসূচি সত্যিই হয়েছিল, কিন্তু এটিকে নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করার যথেষ্ট প্রমাণ নেই। অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কটি অবশ্য এখনো চলমান।


ট্যাগ: যালিফোর্নিয়াযুক্তরাষ্ট্রের খবরঅভিবাসী শ্রমিকঅভিবাসন অভিযানপ্রতিবাদ কর্মসূচিশ্রমিক অধিকারমনরোভিয়াদোকানে বিক্ষোভতথ্য যাচাইযুক্তরাষ্ট্রের রাজনীত

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…