নিউইয়র্কে পাঁচ বছরের শিশুর সামনে বাবাকে গুলি, বিক্ষোভে উত্তাল মানবিক শহর আজ
অভিবাসন অভিযানে গুলিবিদ্ধ ডোমিনিকান বাবা, গাড়িতে থাকা শিশু অক্ষত, মেয়রের প্রতিবাদে ফুঁসছে নিউইয়র্কবাসী আজ বিকেলে ঘটে যাওয়া ঘটনায় স্তম্ভিত দেশবাসী।
গত বুধবার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস এলাকার মার্বেল হিল নামক আবাসিক এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে যা পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিকেল চারটার দিকে যখন স্কুল ছুটি হয়েছে এবং রাস্তায় শিশু ও পরিবারের ভিড় ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা একজন ব্যক্তিকে আটক করার জন্য অভিযান চালায়। ওই ব্যক্তির নাম অস্কার বেগাল, বয়স আটাশ বছর, তিনি ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। তিনি তার ব্যক্তিগত গাড়িতে বসে ছিলেন এবং তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে পেছনের আসনে বসে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিবাসন কর্মকর্তারা তার গাড়িটি ঘিরে ফেলেন এবং কমপক্ষে সাতটি গুলি চালান। একটি গুলি তার ঘাড়ে, বাম কানের নিচে লাগে। শিশুটি শারীরিকভাবে আহত না হলেও মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। তাকে পরে পরিবারের এক সদস্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। তারা দাবি করে যে অস্কার বেগাল অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে অতীতে বড় ধরনের চুরি, হামলা, ডাকাতি, মাদক রাখা এবং অস্ত্র রাখার অভিযোগ রয়েছে। তাদের আরও দাবি ছিল যে তিনি ডোমিনিকান একটি গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত। তবে পরে তারা তাদের বিবৃতি সংশোধন করে গ্যাং সংক্রান্ত বাক্যটি সরিয়ে দেয়। নিউইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জানান, বেগালের বিরুদ্ধে দুই হাজার তেইশ সালে একটি ডাকাতির মামলা এবং দুই হাজার পঁচিশ সালে মাদক বিক্রির মামলা ছিল। দুই হাজার তেইশ সালের মামলায় তিনি চতুর্থ মাত্রার চুরির দায় স্বীকার করেছিলেন এবং দুই হাজার পঁচিশ সালের মামলাটি এখনও আদালতে চলমান।
তবে এই সরকারি বক্তব্য মানতে নারাজ নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র এবং তিনি এই ঘটনাকে অমানবিক এবং অত্যন্ত গুরুতর বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, অভিবাসন কর্মকর্তারা নির্মাণ শ্রমিকদের মতো ভেস্ট এবং মুখোশ পরেছিলেন, তাই তাদের চেনার কোনো উপায় ছিল না যে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। স্কুল ছুটির পর ভিড়ের মধ্যে, একটি শিশুর সামনে গুলি চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা জানি এই সংস্থাটি ভেতর থেকে পচে গেছে। আজকের গুলির ঘটনা তারই ভয়াবহ প্রমাণ যে তারা দায়মুক্তি নিয়ে কাজ করে, তারা দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা এবং আতঙ্ক ছড়ায়।
মেয়র মামদানি জানান, তিনি দুই ঘণ্টা ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিনের সাথে ফোনে কথা বলে আহত ব্যক্তির মুক্তির জন্য আলোচনা করেছেন, কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু হাসপাতাল থেকেই তাকে একটি চিহ্নবিহীন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনাকে মেয়র সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি একটি জঘন্য ঘটনা।
এই ঘটনার পর নিউইয়র্ক শহর জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মার্বেল হিল এলাকায় এবং ম্যানহাটনের ফোলি স্কোয়ারে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তাদের স্লোগান ছিল, কোনো ঘৃণা নয়, কোনো ভয় নয়, অভিবাসীদের এখানে স্বাগত। কোনো বরফ নয়, অর্থাৎ অভিবাসন পুলিশকে সরিয়ে দাও। বিক্ষোভকারীরা মেয়রের সেই বক্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বলেছিলেন, আমাদের পাড়া থেকে অভিবাসন পুলিশকে বের করে দাও, আমাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দাও, আমাদের রাস্তা থেকে বের করে দাও, আমাদের শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখো।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিন মেয়রের বক্তব্যকে বিপজ্জনক এবং শত্রুতা উস্কে দেওয়ার মতো বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মেয়র যদি অভিবাসন সংস্থাকে বাতিল করে দেন, তাহলে শহরের রাস্তা থেকে অপরাধীদের কে সরাবে? খুনি, চোর এবং গ্যাং সদস্যদের কে ধরবে? তিনি আরও দাবি করেন যে কর্মকর্তারা জানতেন না যে গাড়িতে শিশু আছে, এবং শিশুকে বিপদে ফেলার জন্য বাবাই দায়ী।
এই ঘটনাটি এখন আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিয়েছে। আহত ব্যক্তির আইনজীবীরা একটি আবেদন করেছেন যেখানে বলা হয়েছে, তাকে বৈধ পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি পালিয়ে যাবেন বা বিপজ্জনক কিনা তা মূল্যায়ন না করেই আটক করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনের পরিপন্থী। তারা আরও বলেছে, শিশুর সামনে গুলি চালানো বিবেককে নাড়া দেয় এবং সংবিধানে দেওয়া ন্যায্য বিচারের অধিকার লঙ্ঘন করে। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাকে আটক রাখা তার চিকিৎসার প্রতি চরম অবহেলা।
নিউইয়র্ক একটি গণতান্ত্রিক ঘাঁটি এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেই শহরগুলোর মধ্যে একটি যেখানে স্থানীয় পুলিশকে যুক্তরাষ্ট্রীয় অভিবাসন অভিযানে সহায়তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই নীতির কারণেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, শহরের আশ্রয় নীতির কারণেই অপরাধীদের ধরা কঠিন হচ্ছে। আর মেয়র বলছেন, এই অভিযানগুলো শহরের নিরাপত্তা কমিয়ে দিচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
ঘটনাটি সত্য এবং এটি আটই অক্টোবর দুই হাজার ছাব্বিশ সালে ঘটেছে। গুলির সংখ্যা, শিশুর উপস্থিতি, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং বিক্ষোভের তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম যেমন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, নিউইয়র্ক পোস্ট এবং স্থানীয় পুলিশের বিবৃতি দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। মেয়র এবং স্বরাষ্ট্র বিভাগের বক্তব্যও তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাই এটি কোনো গুজব নয়, এটি একটি চলমান এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।




