ট্রাম্পের অনুমোদনেই ফাঁসির সিদ্ধান্ত, সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর

যুক্তরাষ্ট্রে ফোর্ট হুড হামলাকারী নাসির মালিক হাসানের ফাঁসি সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনায় বিতর্ক, মানবাধিকার উদ্বেগ এবং ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

ট্রাম্পের অনুমোদনেই ফাঁসির সিদ্ধান্ত, সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর
ট্রাম্পের অনুমোদনেই ফাঁসির সিদ্ধান্ত, সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর

যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ২০০৯ সালে সংঘটিত ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা চিকিৎসক নাসির মালিক হাসানকে গুলিবাহিনীর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং সেই দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরের সব অংশকে একইভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর ট্রাম্প হাসানের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন। এরপর সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব অ্যাডাম টেলে ৬ অক্টোবর নির্দেশ দেন, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে গুলিবাহিনীর মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। নির্ধারিত সময় স্থানীয় সময় দুপুর একটা। এই তারিখ ও সময়ের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সরকারি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত তারিখ ঘোষণা করা মানেই নির্ধারিত দিনেই দণ্ড কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন আবেদন বা আদালতের নির্দেশ এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগন হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মানুষকে এই ঘটনার পরিণতি দেখতে দেওয়া হবে, যাতে এ ধরনের অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সবাই বুঝতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসে। সামরিক বাহিনীর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা এভাবে ইন্টারনেটে সরাসরি দেখানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন সময়ের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ৯ অক্টোবর তিনি সরাসরি সম্প্রচারের অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১০ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁর সামনে দুটি দিক রয়েছে—সম্প্রচার করা অথবা না করা। তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রচার করলে অন্যরা এমন অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

এখানেই মূল তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প হাসানের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছেন  এ তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে সমর্থিত। কিন্তু সম্প্রচার নিয়ে তাঁর সর্বশেষ বক্তব্য বলছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও বিবেচনাধীন ছিল। অতএব, ‘ট্রাম্প ফাঁসির সরাসরি সম্প্রচার চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেছেন’ এমন বক্তব্যকে সর্বশেষ অবস্থানের সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। আগের বক্তব্যের পাশাপাশি পরবর্তী বক্তব্যও পাঠকের জানা প্রয়োজন।

এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বরের ভয়াবহ ঘটনা। সেদিন টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত কেন্দ্রে গুলি চালান তৎকালীন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও মনোরোগ চিকিৎসক নাসির মালিক হাসান। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন এবং ৩২ জন আহত হন। হামলার সময় তিনি সেনাবাহিনীর মেজর পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে আলোচিত প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

হাসানের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া চলে। ২০১৩ সালের আগস্টে সামরিক আদালতের জুরি তাঁকে ১৩টি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগসহ মোট ৪২টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। পাঁচ দিন পর জুরি তাঁর মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি নির্ধারণ করে। বিচার চলাকালে হাসান নিজের পক্ষে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খুব বেশি উদ্যোগ নেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি হামলার দায় স্বীকার করেছিলেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডকে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাঁর ব্যাখ্যা আদালতের রায় পরিবর্তন করেনি।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হিসেবেও গুলিবাহিনী বেছে নেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সর্বশেষ ১৯৬১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। আর সামরিক বাহিনীতে গুলিবাহিনীর মাধ্যমে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। ফলে হাসানের দণ্ড কার্যকর হলে তা দীর্ঘ কয়েক দশক পর মার্কিন সামরিক বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি বিরল ঘটনা হবে। সেনাবাহিনীর ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট হাসানের সামরিক আদালতের রায় পর্যালোচনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এর পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনার চেয়েও বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে সেটি জনসাধারণকে সরাসরি দেখানোর উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে কারা উপস্থিত থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে। সাধারণত নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ধর্মীয় প্রতিনিধি এবং অনুমোদিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতি সাধারণত নিষিদ্ধ। সামরিক মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা ও উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে কতজন দেখবেন, কীভাবে বয়সভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং সম্প্রচারের দৃশ্য অন্যত্র ছড়িয়ে পড়া কীভাবে ঠেকানো হবে—এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা মানুষের মর্যাদা, নিষ্ঠুর শাস্তি এবং অমানবিক আচরণসংক্রান্ত আইনি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরও প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদর্শনের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ডকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর শাস্তির প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত পরিকল্পনাটিকে আইনত অবৈধ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য জনসাধারণকে দেখানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, সম্প্রচার করা হলেও তিনি নিজে সেটি দেখবেন না। তিনি এমন সম্ভাবনাও প্রকাশ করেছেন যে শেষ পর্যন্ত সম্প্রচারটি নাও হতে পারে। ধর্মীয় নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নের পাশাপাশি মানুষের মৃত্যু নিয়ে জনসমক্ষে প্রদর্শনী তৈরির নৈতিকতা নিয়ে আপত্তি উঠে এসেছে।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য আদালতে আবেদন করার সুযোগ কতটা রয়েছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সামরিক বিধিতে মৃত্যুদণ্ডের সম্প্রচার নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, সম্প্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকতে পারে হাসানের নিজের ক্ষেত্রে। তবে আদালতে নতুন আবেদন করা হলে তার ফল কী হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এমন আবেদন বা আদালতের আদেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়সূচিও বদলে দিতে পারে।

এদিকে, সরাসরি সম্প্রচার হলে শিশু-কিশোরদের কাছে ভয়াবহ দৃশ্য পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। ইন্টারনেটে কোনো অনুষ্ঠান সরাসরি দেখানো হলেও তার দৃশ্য ধারণ করে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে সম্প্রচারের সময় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও পরবর্তী সময়ে দৃশ্যটি কোথায় পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই সমালোচকেরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি শুধু মৃত্যুদণ্ডের আইনগত দিক নয়, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং জনস্বার্থের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে, এই ঘটনার দুটি দিক আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, ২০০৯ সালের হামলায় ১৩ জনকে হত্যার দায়ে হাসানের মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং তা কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেই মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে এবং ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি খোলা রয়েছে। ৩ ডিসেম্বরের নির্ধারিত তারিখের আগে নতুন আইনি পদক্ষেপ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তাই সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসরণ করেই পরবর্তী খবর প্রকাশ করা উচিত।


ট্যাগ: ডোনাল্ড ট্রাম্পনাসির মালিক হাসানফোর্ট হুড হামলাযুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিমৃত্যুদণ্ডসরাসরি সম্প্রচারপেন্টাগনমানবাধিকারসামরিক আদালতআন্তর্জাতিক সংবাদ

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…