প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যু হয়নি, হাসপাতালে চিকিৎসার পর আবার কারাগারে ফিরলেন ক্রিস্টা পাইক
টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টায় বেঁচে যাওয়া ক্রিস্টা পাইক হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরেছেন; তাঁর চিকিৎসা চলছে, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে।
লিখেছেন Desk Reporter- সিএসবি নিউজ ইউএসএ
প্রকাশিত
প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যু হয়নি, হাসপাতালে চিকিৎসার পর আবার কারাগারে ফিরলেন ক্রিস্টা পাইক
৯৮২ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ক্রিস্টা পাইক হাসপাতাল থেকে আবার কারাগারে ফিরেছেন। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান। পঞ্চাশ বছর বয়সী পাইককে ন্যাশভিলের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর ডেবরা কে. জনসন পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এই কেন্দ্রটি নারীদের কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার আগেও তিনি সেখানে বন্দি ছিলেন। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কারাগারে ফেরার পরও তাঁর চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রাণঘাতী ওষুধের দুটি মাত্রা প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়নি। বরং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। একপর্যায়ে আইনজীবীরা তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়েও গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। পরে তিনি জ্ঞান ফিরে পান এবং কথা বলতে শুরু করেন। আইনজীবীদের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, সহায়তা নিয়ে হাঁটাচলাও করতে পেরেছিলেন তিনি। তবে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইককে পেন্টোবারবিটাল নামের একটি ওষুধের দুটি মাত্রা দেওয়া হয়েছিল। এই ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পাইকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফল পাওয়া যায়নি। প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁর হাতে তীব্র ব্যথা এবং গুরুতর শারীরিক জটিলতার লক্ষণ দেখা দেয়। পরে তাঁর দুই হাতে গুরুতর ক্ষত, ফোসকা ও অন্যান্য আঘাতের কথা আইনজীবীরা জানান। তাঁকে অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তার জন্য যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে ঠিক কী কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। চিকিৎসা ও প্রাণঘাতী ইনজেকশন পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর ব্যবস্থায় ত্রুটির সম্ভাবনা উঠে এসেছে। শিরায় প্রবেশের পথ সঠিকভাবে স্থাপন করা না গেলে ওষুধ রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করে আশপাশের টিস্যুতে জমা হতে পারে। এতে ওষুধ প্রত্যাশিতভাবে কাজ না করার পাশাপাশি গুরুতর ক্ষতিও হতে পারে। পাইকের আইনজীবীরা আদালতে দাখিল করা নথিতে অভিযোগ করেছেন, তাঁর শিরায় স্থাপিত নলগুলো সঠিকভাবে বসানো হয়নি। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে এই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
এই ঘটনার পর পাইকের আইনজীবীরা তাঁর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ অক্টোবর টেনেসির একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ব্যবহৃত ওষুধ, সিরিঞ্জ, শিরায় প্রবেশের নল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ছবি, ভিডিও, শব্দ ধারণ করা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ইমেইল এবং প্রক্রিয়া চলাকালে ঘটে যাওয়া জটিলতা-সংক্রান্ত নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই নির্দেশের গুরুত্ব হলো, ভবিষ্যতে তদন্ত ও বিচারিক পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য যেন নষ্ট, পরিবর্তিত বা হারিয়ে না যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কী ঘটেছিল, কারা কী দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রমাণগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যে নির্ধারিত অন্যান্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিত করেছেন। কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডা পদত্যাগ করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পাইকের ঘটনা অবশ্য একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়। ২০২৬ সালের মে মাসে টেনেসিতে টনি ক্যারুথার্স নামের আরেক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টাও শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে একই বছরে দুটি ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের ব্যবহৃত পদ্ধতি ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে দুই ঘটনার পরিস্থিতি এক ছিল না। ক্যারুথার্সের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিরাপথ স্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর পাইকের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পরও তিনি বেঁচে যান।
পাইকের বিরুদ্ধে মামলাটি প্রায় তিন দশক আগের একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে টেনেসির নক্সভিল এলাকায় উনিশ বছর বয়সী কলেজছাত্রী কলিন স্লেমারকে হত্যা করা হয়। পাইক তখন আঠারো বছর বয়সী ছিলেন। মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি তাঁর তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপ এবং শ্যাডোলা পিটারসনের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পর পাইককে পরিকল্পিত হত্যা এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৯৯৬ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তাঁর মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে।
পাইককে ঘিরে আইনি বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অপরাধের সময় তাঁর বয়স ছিল আঠারো বছর। তাঁর আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, অল্প বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ, শৈশবের নির্যাতন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলো তাঁর মামলায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয় শাস্তি নির্ধারণের সময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং নতুন করে আইনি পর্যালোচনার সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর অতীতের মানসিক স্বাস্থ্য ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব দাবি তাঁর অপরাধের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে দেয় না; বরং মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ততা এবং শাস্তি নির্ধারণের ন্যায্যতা নিয়ে আইনি প্রশ্নের অংশ। নিহত কলিন স্লেমারের পরিবারও এই মামলার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। তাই বিষয়টি কেবল একজন বন্দির শারীরিক অবস্থার প্রশ্ন নয়, নিহত ব্যক্তির ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের শাস্তি কার্যকরের দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর থেকে তাঁর আইনজীবীরা বিভিন্ন পর্যায়ে সাজা পুনর্বিবেচনা এবং ক্ষমার আবেদন করেছেন। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারিত ছিল। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ সার্কিট আপিল আদালত প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, শৈশবে যৌন নির্যাতনসহ তাঁর জীবনের গুরুতর অভিজ্ঞতা শাস্তি নির্ধারণের সময় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় মামলাটি নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, একই ব্যক্তির ওপর আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হলে তা আইনগতভাবে কীভাবে বিবেচিত হবে এবং আগের ঘটনার শারীরিক ক্ষতি ও সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়গুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর পাইককে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে তাঁর আইনজীবীরা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু কারাগারে ফিরে যাওয়া মানেই তাঁর চিকিৎসা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, আবার এর অর্থ এই নয় যে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা বাতিল হয়েছে। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা, ব্যর্থ প্রক্রিয়ার তদন্ত এবং চলমান আইনি পদক্ষেপ—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ কারণ জানানো হলে এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশ পাওয়া গেলে মামলার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, বন্দিদের সাংবিধানিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে। একটি নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করতে গিয়ে যদি বন্দি গুরুতর আহত হন এবং তারপরও বেঁচে যান, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে। পাইকের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিয়ম অনুসরণ করেছিলেন কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী পরিবর্তন প্রয়োজন এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য হলো, পাইক হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরেছেন, তাঁর চিকিৎসা চলছে এবং ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে তাঁর ভবিষ্যৎ শাস্তি বা পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।