রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সংকট।
লিখেছেন Desk Reporter- সিএসবি নিউজ ইউএসএ
প্রকাশিত
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
৯৭৪ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে নতুন করে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা বন্ধ করতে ওয়াশিংটন চাপ দিচ্ছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: ইউক্রেনের পক্ষের সূত্রের বরাত দিয়ে এমন হুমকির খবর প্রকাশিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং গুরুতর কূটনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখা উচিত।
২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মিয়ামিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপের প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়। ইউক্রেনের প্রতিনিধিদল রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু আলোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার ঘোষণা দেন। এতে ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা বিস্মিত হন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এমন হুমকি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন পক্ষ ইউক্রেনকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে এবং এমন পদক্ষেপ এড়ানো উচিত, যা মার্কিন ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি রপ্তানি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি পরিবহনকেন্দ্রে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি খাত দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থের জোগান দেয়। উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত করা গেলে রুশ সামরিক বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারের রাজস্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ হলো, রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমতে পারে। এতে পরিবহন, কৃষি, পণ্য সরবরাহ এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে ট্রাক পরিবহন থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ইউক্রেনের সামরিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য এখন পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে ট্রাম্প ও পুতিনের সমঝোতা। ৯ অক্টোবর ট্রাম্প জানান, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করবে। পরবর্তী সময়ে আরও পাঁচ লাখ টন এবং তার পরে অতিরিক্ত দশ লাখ টন সরবরাহের কথাও ঘোষণা করা হয়। এর বাইরেও আরও সরবরাহের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘোষণার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক ছাড় দিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপত্র অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে রুশ ডিজেল আমদানির সুযোগ ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাখা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়ার ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বরং নির্দিষ্ট জ্বালানি লেনদেনের জন্য সীমিত সময়ের ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়াকে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হলে দেশটি অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করবে এবং সেই অর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারবে। ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, একদিকে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির পথ সহজ করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় কিয়েভের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। জেলেনস্কির অবস্থান হলো, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের কোনো সমঝোতা হলে সেটি উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। অর্থাৎ ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করলে রাশিয়াকেও ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো, পানি সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। কিয়েভের বক্তব্য, একতরফাভাবে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করে দিলে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এর আগেও দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধের কারণে স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। ইউক্রেনের বক্তব্য, রাশিয়া যদি দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানার অধিকার ইউক্রেনের রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা গোয়েন্দা তথ্য, উপগ্রহচিত্র, নজরদারি এবং লক্ষ্য শনাক্তকরণসংক্রান্ত সহায়তা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব তথ্যের মাধ্যমে রুশ সেনাদের অবস্থান, সামরিক সরঞ্জামের গতিবিধি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়। তবে কোন ধরনের তথ্য বর্তমানে কতটা সরবরাহ করা হচ্ছে, কিংবা সম্ভাব্য কোনো নিষেধাজ্ঞায় ঠিক কোন সহায়তা বন্ধ হতে পারে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই।
গোয়েন্দা সহায়তা সীমিত করা হলে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার পরিকল্পনা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কিছু সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউক্রেনের সব সামরিক অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে। দেশটি নিজস্ব গোয়েন্দা সক্ষমতা, দেশীয়ভাবে তৈরি ড্রোন এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তির ওপরও নির্ভর করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সহায়তাও ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রভাব নির্ভর করবে সহায়তার কোন অংশ সীমিত করা হচ্ছে এবং ইউরোপ ও ইউক্রেন কতটা বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে তার ওপর।
এদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এসব হামলায় শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি আয় এবং পরিবহনব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিবাজারেও আন্তর্জাতিক সরবরাহের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে। তবে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি করলেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে বাড়তি ডিজেল সরবরাহের পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় সীমিত হতে পারে। ফলে এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমানোর ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির সুযোগ বাড়লে দেশটি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। অর্থাৎ মার্কিন ভোক্তাদের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তি এবং রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিতে অর্থ প্রবেশের ঝুঁকি—দুটি বিষয়ই এখানে বিবেচ্য।
১০ অক্টোবর ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্ব নিয়েও সমালোচনা করেন এবং বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। একই সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হামলা অব্যাহত থাকায় শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ এবং ইউক্রেনের সামরিক কৌশল নিয়ে এই বিরোধ তাই শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি ইউরোপের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজার এবং যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গেও জড়িত।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়েছে এমন খবরের পেছনে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থাকলেও সরাসরি হুমকির বিষয়টি এখনো বিতর্কিত। ইউক্রেনীয় সূত্রের বক্তব্য এবং মার্কিন কর্মকর্তার অস্বীকৃতি—দুটিই বিবেচনায় রাখা জরুরি। অন্যদিকে, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত এবং ইউক্রেনের হামলা বন্ধে মার্কিন চাপ বাস্তব কূটনৈতিক বিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কি না, ইউক্রেন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখে কি না এবং রাশিয়া পাল্টা হামলা বন্ধে সম্মত হয় কি না—এসব বিষয়ই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করবে।