ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ফ্লোরিডা লণ্ডভণ্ড, প্রাণহানি বেড়ে চার, বিদ্যুৎহীন লাখো মানুষ
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রাণহানি, গাছপালা উপড়ে পড়া, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও বন্যার ঝুঁকিতে বিপর্যস্ত উপকূলীয় জনজীবন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ইসাইয়াসের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি, উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস ও গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। ঝড়টি দুর্বল হয়ে স্থলভাগের আরও ভেতরে চলে গেলেও আকস্মিক বন্যা, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা কাটেনি। শনিবার, ১০ অক্টোবর, অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর রন ডিস্যান্টিস ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতা সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে চারজন হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
প্রাথমিক খবরে অন্তত দুজনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। তাঁদের একজন ফ্লোরিডার এসকাম্বিয়া কাউন্টিতে গাছ ভেঙে বাড়ির ওপর পড়ে মারা যান। অন্যজন আলাবামা অঙ্গরাজ্যের জেফারসন কাউন্টিতে একই ধরনের ঘটনায় প্রাণ হারান বলে স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে পরবর্তী সংবাদে আরও প্রাণহানির খবর আসে। ফ্লোরিডায় একটি বন্ধ গ্যারেজের ভেতরে জেনারেটর চালানোর কারণে সৃষ্ট বিপজ্জনক গ্যাসের প্রভাবে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান। এ ঘটনায় একই পরিবারের চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যায়।
ঘূর্ণিঝড়টি শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে নয়টার দিকে ফ্লোরিডার ডেস্টিন এলাকার কাছে উপকূলে আঘাত হানে। সে সময় ঝড়টি ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। এর বাতাসের সর্বোচ্চ স্থায়ী গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৬৯ কিলোমিটার। উপকূল অতিক্রম করার পর ঝড়টি উত্তর দিকে এগিয়ে যায় এবং শনিবার ভোরে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু ঝড়ের শক্তি কমে গেলেই বিপদ শেষ হয়ে যায় না। প্রচুর বৃষ্টির পানি, নদীর উজানের প্রবাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত নালা-নর্দমার কারণে পরবর্তী কয়েক দিনও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ফ্লোরিডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভর্নরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরের দিকে অঙ্গরাজ্যে চার লাখের বেশি গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ঝড়ের পর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। ফ্লোরিডা, আলাবামা ও আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলো মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন গ্রাহকের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিদ্যুৎ সংস্থার কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত তার মেরামত, ভেঙে পড়া গাছ সরানো এবং সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেন। গভর্নর জানান, হাজার হাজার কর্মী বিদ্যুৎ ফিরিয়ে আনার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
ঝড়ের তীব্র বাতাসে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও উপকূলীয় স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বড় গাছ ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে। পেনসাকোলা এলাকায় একটি হোটেলের ছাদ উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। ডেস্টিন এলাকায় নৌযান রাখার একটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তায় পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। উদ্ধারকর্মী ও সড়ক বিভাগের কর্মীরা গাছের ডালপালা, ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা সচল করার চেষ্টা চালান।
আবহাওয়াবিদ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের প্রধান উদ্বেগ এখন আকস্মিক বন্যা। ঝড়ের কেন্দ্র উপকূল থেকে সরে গেলেও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকা, নদীতীর এবং আগে থেকেই পানিতে ভেজা মাটির অঞ্চলে নতুন করে বিপদ দেখা দিতে পারে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু নদীর পানি আরও কয়েক দিন বাড়তে পারে। ফলে শনিবারের পরও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা জরুরি। বাসিন্দাদের প্রবাহিত পানি বা জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে নিষেধ করা হয়েছে। অল্প গভীর মনে হলেও পানির স্রোত গাড়িকে ভাসিয়ে নিতে পারে।
জরুরি সেবার কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন তার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ঝড়ের পর মাটিতে পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎ থাকতে পারে, যা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে জেনারেটর ব্যবহারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জেনারেটর কখনো ঘরের ভেতরে, বন্ধ গ্যারেজে কিংবা জানালা-দরজার কাছে চালানো উচিত নয়। এটি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড নামের বিষাক্ত গ্যাস গন্ধহীন হওয়ায় মানুষ বুঝতে না পেরেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। জেনারেটর খোলা জায়গায়, ভবনের দরজা-জানালা ও বাতাস চলাচলের পথ থেকে দূরে রাখতে হবে।
পরিবহনব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে। শনিবার সকালে উত্তর-পশ্চিম ফ্লোরিডার কিছু প্রধান সড়ক পরিষ্কার করে আবার চালু করার খবর পাওয়া যায়। তবে সব সড়কের পরিস্থিতি এক রকম নয়। কোথাও গাছ সরানো হলেও পানি জমে থাকার কারণে চলাচলে ঝুঁকি থাকতে পারে। বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রমও বিভিন্ন সময় সীমিত বা বন্ধ ছিল। নর্থওয়েস্ট ফ্লোরিডা বিচেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার খবর দেওয়া হলেও ডেস্টিন-ফোর্ট ওয়ালটন বিচ এবং পেনসাকোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্নের কথা জানানো হয়েছিল। যাত্রীদের বিমান সংস্থার সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে যাত্রা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার, সড়ক পরিষ্কার, বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধারকারী দল, নৌযান ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিপজ্জনক এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি বাসিন্দাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্দেশনা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরে যাওয়া কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ করা উচিত নয়।
এই দুর্যোগের অর্থনৈতিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। বিদ্যুৎহীন ঘরবাড়ি, বন্ধ দোকানপাট, ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরিবার ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে। খাবার সংরক্ষণ, পানীয় জল, ওষুধ এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধা ব্যাহত হওয়ায় বয়স্ক মানুষ, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে এমন বাসিন্দারা বিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা দপ্তর এবং সরকারি সহায়তা সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাণহানির সংখ্যা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন গ্রাহকের হিসাব সময়ের সঙ্গে বদলেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে দুজনের মৃত্যুর কথা থাকলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে চারজনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাই আগের সংখ্যাকে চূড়ান্ত বলে প্রচার করা ঠিক হবে না। একইভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাবও এখনো পরিবর্তিত হতে পারে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি, নদীর পানি, সড়কের অবস্থা এবং বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি আবহাওয়া সংস্থার পরবর্তী ঘোষণাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা।
ফ্লোরিডার এই ঝড় আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হয়ে গেলেও তার পরবর্তী বিপদ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। গাছ পড়ে থাকা, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা এবং জেনারেটরের ভুল ব্যবহার সবই প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকা, জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।




