যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্রেসনো শহরে বাড়ির সামনের ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে থাকা এক কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তাকে ঘিরে সহিংস ঘটনার পর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ৩২ বছর বয়সী ডেভিড গনজালেজ নামের ওই কর্মকর্তা এক পরিবারের বাড়ির উঠানে ঘুমিয়ে ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁকে সেখান থেকে চলে যেতে বলার পর ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয়। পুলিশের অভিযোগ, ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর গনজালেজকে নেশাগ্রস্ত ও উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। এরপর তিনি ওই বৃদ্ধকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন। বাবাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাঁর মেয়েকেও আক্রমণ করার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বৃদ্ধ নিজের কাছে বৈধভাবে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গনজালেজকে একবার গুলি করেন। গুলিতে আহত হওয়ার পরও তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা গুরুতর অপরাধের অভিযোগে হেফাজতে রয়েছেন। ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ভোররাতে। ফ্রেসনো পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত তিনটার কিছু পরে শহরের ইস্ট ডাডলি অ্যাভিনিউ ও নর্থ ব্রডওয়ে স্ট্রিটের কাছাকাছি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ওই এলাকার এক নারী বাড়িতে ফিরে সামনের উঠানে একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন। পরে তাঁকে ডেভিড গনজালেজ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা এবং টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নারীটি একই বাড়িতে বসবাসকারী তাঁর ৭২ বছর বয়সী বাবাকে বিষয়টি জানান। এরপর বৃদ্ধ বাড়ির বাইরে এসে গনজালেজকে জাগিয়ে দেন এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুম থেকে ওঠার পর গনজালেজের আচরণ স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে নেশাগ্রস্ত ও উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। এরপর তিনি বৃদ্ধের ওপর শারীরিকভাবে আক্রমণ চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
বাবাকে আক্রান্ত হতে দেখে তাঁর মেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশের অভিযোগ, গনজালেজ ওই নারীকেও শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন। এতে তিনিও মাটিতে পড়ে যান। বাবা ও মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে বৃদ্ধ নিজের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র বের করেন। পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, তিনি একবার গুলি চালান এবং গুলিটি গনজালেজের শরীরের মধ্যভাগে লাগে।
এ ঘটনার পর আহত কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ওই নারীর প্রেমিক। তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা হলেও ঘটনার সময় দায়িত্বে ছিলেন না। তিনি ঘটনাস্থলে এসে গনজালেজকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখেন। পরে গুলির শব্দ এবং গোলাগুলির খবর পেয়ে ফ্রেসনো পুলিশের সদস্যরা সেখানে পৌঁছান। পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে গনজালেজকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর শরীরে গুলির ক্ষত ছিল। পরে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক সংবাদে গনজালেজের শারীরিক অবস্থা গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা পাওয়া প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট নয়। তাই তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো দাবি করা যাচ্ছে না। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গনজালেজের বিরুদ্ধে গুরুতর শারীরিক আঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে মারধর, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে আটক রাখা হয়েছে। তবে অভিযোগ আনা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্ত শেষ হওয়া এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের আগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। অন্যদিকে, গনজালেজকে গুলি করা ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। ফ্রেসনো পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃদ্ধের কাছে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধভাবে ছিল এবং তিনি নিজের ও মেয়ের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত করা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আত্মরক্ষার দাবি নিয়ে সব ধরনের আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।
ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গনজালেজ তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন না। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একাই ওই এলাকায় ছিলেন। কেন তিনি ওই পাড়ায় গিয়েছিলেন, কেন অপরিচিত একটি বাড়ির সামনের উঠানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এবং ঘটনার আগে কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা নিশ্চিত কোনো কারণ প্রকাশ করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে নানা দাবি দেখা গেলেও, পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে সমর্থিত নয়—এমন দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তাদের আচরণ ও জবাবদিহি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যাঞ্চলে অভিবাসনবিষয়ক অভিযান বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রেসনো ও আশপাশের এলাকায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে গনজালেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে ওই অভিযানগুলোর সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ফ্রেসনোর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মিগেল আরিয়াস ঘটনাটির পর কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের আচরণ ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।
ঘটনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তাবিষয়ক বিভাগের একজন মুখপাত্র বিস্তারিত মন্তব্য না করে সাংবাদিকদের ফ্রেসনো পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট অভিবাসন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যাতে কর্মকর্তাটির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। তবে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তার চূড়ান্ত ফল কী এবং গনজালেজের চাকরির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনো সীমিত।
পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার ভিডিওচিত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আশপাশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কে প্রথম শারীরিক আক্রমণ শুরু করেছিলেন, সংঘর্ষের সময় কী ঘটেছিল এবং গুলি চালানোর মুহূর্তে কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়েছিল এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাতের বেলায় বাড়ির উঠানে অপরিচিত কাউকে দেখতে পেলে আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। সম্ভব হলে নিরাপদ স্থানে থাকা, জরুরি পুলিশি সহায়তা চাওয়া এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই পরামর্শ ঘটনাটির কোনো পক্ষকে দায়ী করা বা আত্মরক্ষার আইনি বৈধতা নির্ধারণের বিকল্প নয়।