যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুই শিশুসহ নিহত আট, আত্মহত্যা করলেন হামলাকারী
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় ভয়াবহ পারিবারিক গুলিতে অন্তঃসত্ত্বা নারী, দুই শিশুসহ আটজন নিহত, পরে প্রাণ হারান অভিযুক্ত ব্যক্তি; শোকস্তব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা, তদন্ত চলছে।
লিখেছেন Desk Reporter- সিএসবি নিউজ ইউএসএ
প্রকাশিত
যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুই শিশুসহ নিহত আট, আত্মহত্যা করলেন হামলাকারী
৮৬২ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের এরি শহরে একটি বাড়িতে ভয়াবহ গুলির ঘটনায় অন্তঃসত্ত্বা নারী, দুই শিশুসহ আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, আটজনকে গুলি করে হত্যার পর ওই ব্যক্তি নিজেই নিজের প্রাণ নিয়েছেন। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর বিকেলে ঘটা এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার, ১০ অক্টোবর পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত জানায়। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্সের প্রতিবেদনেও হতাহতের সংখ্যা এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মিল পাওয়া গেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে এরি শহরের পেরি স্ট্রিটের সাতশ নম্বর ব্লকের একটি বাড়িতে। শুক্রবার বিকেল প্রায় ৪টা ৫০ মিনিটে গুলির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বাড়িটির ভেতরে একাধিক মানুষকে গুলি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। সেখানে পৌঁছে পুলিশ প্রথমে বাড়ির বাইরে দুই নারীর মরদেহ দেখতে পায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং ভেতরে আরও কেউ বিপদের মধ্যে আছেন কি না, তা যাচাই করতে অভিযান চালায়।
এরি শহরের পুলিশপ্রধান রিক লোরাহ জানান, নিহত আটজনের মধ্যে সাতজনের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। বাকি একজন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা নারীর পরিচিত। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৫১ বছর বয়সী এক নারী, ৩৭ বছর বয়সী আরেক নারী, পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে, প্রায় ২২ মাস বয়সী একটি মেয়ে, ৪৪ বছর বয়সী এক নারী, ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ, ২১ বছর বয়সী এক তরুণ এবং আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ২৪ বছর বয়সী এক নারী। কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে নিহতদের নাম প্রকাশ করেনি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আনুষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তদন্তকারীদের কাছে পাওয়া শব্দ ও দৃশ্যসংক্রান্ত প্রমাণ থেকে ঘটনার আগের কয়েকটি মুহূর্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। পুলিশপ্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির ভেতর থেকে চাপা গুলির শব্দ শোনার কিছুক্ষণ পর দুই নারী সেখানে আসেন। তাঁরা উদ্বিগ্ন অবস্থায় বাড়ির দরজায় বারবার আঘাত করছিলেন এবং সাহায্য চাইছিলেন বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তি বাড়ির বাইরে এসে তাঁদের গুলি করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য। পরে তিনি আবার বাড়ির ভেতরে ফিরে যান।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাইরে ওই দুই নারীর মরদেহ দেখতে পায়। বাড়ির ভেতরে আরও মানুষ থাকার আশঙ্কায় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দূরনিয়ন্ত্রিত উড়ন্ত যন্ত্র ও রোবট ব্যবহার করা হয়। এরপর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ আরও ছয়জনের মরদেহ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় পায়। দুই শিশুর মরদেহ নিচতলায় পাওয়া যায়। অন্য কয়েকজনকে সিঁড়ির কাছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোতলায় পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনাস্থলের বিবরণ প্রকাশ করতে গিয়ে পুলিশপ্রধান বলেন, এমন দৃশ্য তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। নিহতদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আরও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
ঘটনাটি তদন্তে পুলিশ গুলির শব্দ শনাক্ত করার একটি স্বয়ংক্রিয় সতর্কব্যবস্থার সহায়তা নেয়। ওই ব্যবস্থায় আশপাশে স্থাপিত শব্দগ্রাহক যন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভাব্য গুলির শব্দ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়। পুলিশপ্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, সতর্কবার্তা পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, কর্মকর্তারা পৌঁছানোর পর বাড়ির ভেতরে নতুন করে গুলি চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযানের সময় বিশেষ বাহিনীর ব্যবহৃত শব্দসৃষ্টিকারী বিস্ফোরক যন্ত্রের আওয়াজকে কেউ কেউ গুলির শব্দ বলে ভুল করে থাকতে পারেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও যেন ভুল তথ্য না ছড়ায়, সে বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে। শহর কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সব মৃত্যুর ঘটনা পুলিশ পৌঁছানোর আগেই ঘটেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করায় প্রাণহানি ঘটেছে—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার সম্পূর্ণ সময়ক্রম, অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণ এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি। কেন ওই ব্যক্তি পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের লক্ষ্য করে গুলি চালালেন, তা তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। পুলিশপ্রধান জানান, নিহত দুই নারীর মুঠোফোন পরীক্ষা করা হবে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হবে। তাঁদের কাছে এমন কোনো তথ্য ছিল কি না, যা ঘটনার আগে বাড়িটির ভেতরে কী ঘটছিল তা বুঝতে সাহায্য করবে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা অন্য কোনো কারণকে এখনই হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো এই ঘটনার পর এরি শহরের মেয়র দারিয়া ডেভলিনের সঙ্গে কথা বলেন এবং অঙ্গরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেন। মেয়র নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এই কঠিন সময়ে পুরো স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাঁদের পাশে রয়েছে। তিনি আরও জানান, পুলিশ সদস্যদেরও ভয়াবহ এই ঘটনার মানসিক চাপ বহন করতে হবে, কারণ তাঁরাও একই সমাজের অংশ এবং এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া তাঁদের জন্যও গভীর আঘাতের বিষয়।
জেলা অ্যাটর্নি এলিজাবেথ হার্জ জনসাধারণকে গুজব, অনুমান ও যাচাই না করা তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এমন ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু ভুল তথ্য নিহতদের পরিবারের শোক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সরকারি বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বাইরে কোনো দাবি প্রচার না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা চলছে।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। পুলিশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, এই ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, আটজন নিহত ব্যক্তি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যু—এই দুই হিসাব এক নয়। স্থানীয় করোনারের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিহত অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভের শিশুর মৃত্যুকেও হত্যাজনিত মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত আটজন নিহতের সংখ্যার মধ্যে গর্ভের শিশুকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে গণনা করা হয়নি। ফলে কোনো প্রতিবেদনে আটজন নিহতের কথা বলা হলে সেটি আটজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে বোঝায়; আর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যোগ করলে মোট মৃতের সংখ্যা নয়। গর্ভের শিশুর বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলে হিসাবের এই পার্থক্য পাঠকের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি। এরি শহর যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ শহর থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সাধারণ আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে এমন প্রাণঘাতী ঘটনা স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাবোধকে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে। তদন্তকারীরা এখন ঘটনার আগে বাড়িতে কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে নিহতদের সম্পর্ক কী ছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো পূর্ববর্তী বিরোধ বা সতর্কসংকেত ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম এবং নিহতদের পূর্ণ পরিচয় সংবাদ সম্মেলনের সময় জানানো হয়নি। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যও এখনো নিশ্চিত নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ব্যক্তির নাম, পারিবারিক বিরোধের দাবি বা ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কারণের কথা যাচাই ছাড়া সত্য বলে প্রচার করা উচিত নয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঘোষণার ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে। এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হলো, ৯ অক্টোবর এরি শহরের একটি বাড়িতে গুলির ঘটনায় আটজন নিহত হন, অভিযুক্ত ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিও মারা যান এবং পুলিশ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।