ব্রেকিং
কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারিয়ে চাপে ট্রাম্প, আটকে যেতে পারে অভিবাসন ও বাজেটের বড় সিদ্ধান্তবাবাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার, সেই পরিবারের মেয়েই এবার নিউইয়র্কের সিনেটেপর্তুগালে বাংলাদেশিদের কাজের অনুমতিপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত, অনিশ্চয়তায় হাজারো কর্মপ্রত্যাশী৭ নভেম্বরের আয়োজন ঘিরে প্রশ্ন, তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার হত্যার বিচার কোথায়?উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে নিউইয়র্কে, গাড়ির ধাক্কায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষণায় নিহত গ্রাম পুলিশ পরিবার পেল সহায়তার আশ্বাস

ঢাকায় মহাসমাবেশে আসার পথে গরমে অসুস্থ হয়ে দুই গ্রাম পুলিশ সদস্যের মৃত্যুতে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও চাকরির ঘোষণা দিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষণায় নিহত গ্রাম পুলিশ পরিবার পেল সহায়তার আশ্বাস
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষণায় নিহত গ্রাম পুলিশ পরিবার পেল সহায়তার আশ্বাস

রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশের দিনটি আনন্দের হওয়ার কথা ছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্যের মিলনমেলায় পরিণত হওয়ার কথা ছিল দিনটি। কিন্তু সেই দিনটি শেষ পর্যন্ত শোকের দিন হয়ে গেল। সমাবেশে যোগ দিতে আসার পথে তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে দুইজন গ্রাম পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় পুরো সমাবেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের পরিবারে চলছে কান্নার রোল। সহকর্মীদের চোখে এখনও ভাসছে সকালের সেই মুখগুলো। যারা নিজেদের দাবি আদায়ের আশা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন, তাদের দুইজন আর বাড়ি ফিরতে পারলেন না। তাদের মরদেহ ফিরে যাচ্ছে নিজ নিজ গ্রামে।

সাতই নভেম্বর শনিবার রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছিল গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশ। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। কেউ বাসে এসেছেন, কেউ ট্রেনে এসেছেন, কেউ এসেছেন অন্য যানবাহনে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার পর অনেকেই ক্লান্ত ছিলেন। তার ওপর ছিল তীব্র গরম। ঢাকার বাতাসে সেদিন আর্দ্রতা ছিল বেশি। রোদের তাপও ছিল প্রখর। এই গরমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন কয়েকজন সদস্য। তাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যায়। তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা তাদের বাঁচাতে পারেননি। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতরা হলেন রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের জমসেদ আলী এবং ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার চুরাইন ইউনিয়নের কাইমুদ্দিন। জমসেদ আলীর বয়স ছিল সাতচল্লিশ বছর। কাইমুদ্দিনের বয়স ছিল আটান্ন বছর। দুইজনই দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম পুলিশের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। নিজ নিজ এলাকায় তারা পরিচিত মুখ ছিলেন। গ্রামের মানুষের সুখে দুঃখে তারা পাশে থাকতেন। রাতে গ্রাম পাহারা দেওয়া, গ্রামের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা, বিভিন্ন তথ্য পৌঁছে দেওয়া, এই সব কাজেই তারা ছিলেন সামনের সারিতে। তাদের মৃত্যুতে নিজ নিজ গ্রামে নেমে এসেছে শোক। পরিবারের লোকজন বিশ্বাস করতে পারছেন না, সকালে সুস্থ মানুষটি ঢাকায় গিয়ে আর ফিরে এলেন না।

জমসেদ আলীর পরিবারে এখন শুধুই কান্না। স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন সবাই ভেঙে পড়েছেন। তিনি ছিলেন পরিবারের মূল উপার্জনকারী। তার আয় দিয়ে চলত সংসার। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচও চলত সেই আয় দিয়ে। হঠাৎ তার চলে যাওয়ায় পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা কাইমুদ্দিনের পরিবারেও। তিনিও ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। তার ওপর নির্ভর করত পুরো পরিবার। বয়স বেশি হলেও তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতেন। কখনো দায়িত্বে অবহেলা করতেন না। ঢাকায় সমাবেশে যাওয়ার সময় পরিবারের লোকজন তাকে বিদায় দিয়েছিলেন হাসিমুখে। কেউ ভাবেননি, এটাই হবে শেষ বিদায়।

এই ঘটনার পর সমাবেশের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। অনেক সদস্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ নিহতদের জন্য দোয়া করেন। কেউ কেউ নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানান। সমাবেশে উপস্থিত অনেকেই বলেন, গ্রাম পুলিশ সদস্যরা অনেক কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বেতন কম। সুযোগ সুবিধাও কম। তারপরও তারা দিনরাত কাজ করেন। তাদের জন্য আরও ভালো ব্যবস্থা থাকা দরকার। বড় সমাবেশে আসার সময় তাদের জন্য পর্যাপ্ত পানি, ছায়া, চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

সমাবেশ শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। এরপর যান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অসুস্থ ও আহত গ্রাম পুলিশ সদস্যদের খোঁজখবর নেন তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। চিকিৎসার সার্বিক অবস্থা জানতে চান। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না। অসুস্থ ও আহত সদস্যদের চিকিৎসার সব খরচ সরকার বহন করবে বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেন। তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, এই মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সরকার নিহতদের পরিবারের পাশে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে নগদ তিন লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। এছাড়া নিহতদের পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে গ্রাম পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এই ঘোষণায় কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন পরিবারের লোকজন। তবে প্রিয়জন হারানোর শোক টাকা দিয়ে পূরণ হয় না, এটা সবাই জানেন।

সরকারি খরচে নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সম্মানজনক দাফন কাফনের সার্বিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। মরদেহ পৌঁছানোর সময় স্থানীয় প্রশাসনের লোকজনও উপস্থিত থাকবেন। পরিবারের লোকজন যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।

এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বড় সমাবেশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। গরমের দিনে এত বড় সমাবেশে আসা হাজার হাজার মানুষের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক সদস্যদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা দরকার বলে মনে করছেন অনেকেই। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, বসার জায়গা, ছায়ার ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, এগুলো থাকা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই বলছেন, সমাবেশস্থলে আসার পথে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা কেন্দ্র রাখা উচিত ছিল। গরমে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল।

গ্রাম পুলিশ বাহিনী দেশের গ্রামীণ শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে কাজ করেন। গ্রামের চুরি, ডাকাতি, মারামারি, বিরোধ মেটানো, বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা, রাতে পাহারা দেওয়া, এসব কাজে তারা নিয়োজিত থাকেন। তাদের কাজের পরিধি অনেক বড়। কিন্তু তাদের সুযোগ সুবিধা সে তুলনায় কম। তাদের বেতন, ভাতা, পোশাক, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। মহাসমাবেশের মূল উদ্দেশ্যও ছিল তাদের দাবিগুলো তুলে ধরা। কিন্তু দুইজন সহকর্মীর মৃত্যুতে সেই দাবির আন্দোলন এখন শোকে পরিণত হয়েছে।

নিহতদের সহকর্মীরা বলছেন, জমসেদ আলী ছিলেন অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র মানুষ। কখনো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। দায়িত্বের প্রতি ছিলেন আন্তরিক। গ্রামের মানুষ তাকে ভালোবাসতেন। কাইমুদ্দিনও ছিলেন তেমনই। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি নতুনদের পরামর্শ দিতেন। তার কাছ থেকে অনেকেই কাজ শিখেছেন। তাদের এই চলে যাওয়া সহজে মেনে নিতে পারছেন না কেউ।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সমাবেশস্থলে আসার পথে অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। গরমে অসুস্থ আরও কয়েকজন সদস্যকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের অবস্থা এখন স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। চিকিৎসকরা তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

এই ঘটনার পর ঢাকার দুই হাসপাতালে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের ভিড় জমে। অনেকে অসুস্থ সহকর্মীদের দেখতে হাসপাতালে যান। কেউ কেউ নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। হাসপাতালের সামনে তখন আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। দীর্ঘ যাত্রা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, বিশ্রামের অভাব, এসব মিলিয়ে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বড় সমাবেশে আসার সময় বয়স্কদের জন্য বিশেষ সতর্কতা দরকার। তাদের জন্য আলাদা যানবাহন, পর্যাপ্ত পানি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামের জায়গা রাখা উচিত। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, গরমে বেশি করে পানি খেতে হবে। রোদে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। মাথা ঢেকে রাখতে হবে। অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত ছায়ায় গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।

নিহতদের পরিবার এখন সরকারের ঘোষণার বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে আছে। তিন লাখ টাকা করে সহায়তা কবে পাবেন, চাকরির বিষয়টি কত দ্রুত হবে, এসব নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন আছে। পরিবারের লোকজন চান, ঘোষণা যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। কারণ পরিবারের উপার্জনকারী মানুষটি চলে যাওয়ায় তারা এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় সরকারের সহায়তা তাদের জন্য বড় ভরসা।

এই ঘটনা গ্রাম পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি বড় ধাক্কা। তাদের দাবি আদায়ের আন্দোলনের মধ্যেই এই মৃত্যু তাদের আরও ব্যথিত করেছে। তবে তারা বলছেন, নিহত সহকর্মীদের স্মৃতিকে সামনে রেখে তারা আরও ঐক্যবদ্ধ হবেন। তাদের দাবিগুলো যাতে পূরণ হয়, সেজন্য শান্তিপূর্ণভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

ঢাকায় মহাসমাবেশের দিনটি তাই এখন শুধু একটি সমাবেশের দিন নয়, হয়ে গেছে দুইজন গ্রাম পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর দিন। যারা গ্রামের শান্তির জন্য জীবনভর কাজ করেছেন, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের দাবি জানাতে এসে প্রাণ হারালেন। তাদের এই আত্মত্যাগ গ্রাম পুলিশের ইতিহাসে মনে রাখা হবে। তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এখন সবার দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবার উচিত তাদের পাশে থাকা। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের ভরণপোষণ, এসব বিষয়ে সহায়তা করা দরকার।

ট্যাগ: গ্রাম পুলিশমহাসমাবেশঢাকাগরমে মৃত্যুজমসেদ আলীকাইমুদ্দিনস্থানীয় সরকারমীর শাহে আলমআর্থিক সহায়তাচাকরির ঘোষণাহাসপাতালশোকগ্রাম পুলিশের দাবি

প্রতিবেদক

CSB News USA

মন্তব্য ০

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।