ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৪৮ মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তনের উদ্যোগ, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পাঠাতে চান গভর্নর
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ বন্দির সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউজম। সিদ্ধান্তটি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও নিহতদের স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ বন্দির সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউজম। গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার তিনি ঘোষণা দেন, অঙ্গরাজ্যের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক বন্দির সাজা প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের জন্য ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। বাস্তবায়িত হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহারে মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তনের ঘটনাগুলোর একটি হবে।
নিউজমের ঘোষণায় ক্যালিফোর্নিয়ার দীর্ঘদিনের মৃত্যুদণ্ডনীতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সিদ্ধান্তটি এখনো সব বন্দির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হয়নি। অঙ্গরাজ্যের ৫৪৮ বন্দির মধ্যে ৩৮২ জনের সাজা পরিবর্তনের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। বাকি বন্দিদের ক্ষেত্রে গভর্নর তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
গভর্নর তাঁর খোলা চিঠিতে বলেছেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, বিচারব্যবস্থায় ভুলের সম্ভাবনা, বৈষম্য এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি আরও মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করেও অপরাধীদের কারাগারে রাখা সম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। অঙ্গরাজ্যটিতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে। ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিউজম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। সে সময় তিনি সান কুয়েন্টিন কারাগারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষ বন্ধের উদ্যোগও নেন। তবে তাঁর স্থগিতাদেশের কারণে মৃত্যুদণ্ডের আইন বাতিল হয়নি; আদালত এখনো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের পক্ষে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবস্থান নিয়েছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নসহ মৃত্যুদণ্ডবিরোধী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় ভুল রায় ও বর্ণগত বৈষম্যের ঝুঁকি রয়েছে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে কারাবাসের সাজাকে তাঁরা সমর্থন করছেন।
অন্যদিকে নিহত ব্যক্তিদের স্বজন এবং মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা গভর্নরের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভয়াবহ অপরাধে নিহতদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে। আদালত ও বিচারকদের দেওয়া সাজা পরিবর্তনের উদ্যোগ তাঁদের কষ্ট আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু হত্যা ও একাধিক হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তনের তালিকায় এমন কয়েকজন বন্দিও রয়েছেন, যাঁদের অপরাধ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রিচার্ড অ্যালেন ডেভিস রয়েছেন, যিনি ১৯৯৩ সালে ১২ বছর বয়সী পলি ক্লাসকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত হন। এ ছাড়া চার্লস এনজি নামের এক বন্দিও রয়েছেন, যিনি ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে একাধিক হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হন।
গভর্নর নিউজমের এই পদক্ষেপের অর্থ ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের আইন পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। এটি বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাজা পরিবর্তনের উদ্যোগ। ভবিষ্যতে নতুন কোনো গুরুতর অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড চাওয়া বা আদালতের রায় দেওয়ার আইনি সুযোগ এখনো বহাল রয়েছে।
নিউজমের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা এখন ক্যালিফোর্নিয়া সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করছে। অঙ্গরাজ্যটির বিচারব্যবস্থা, অপরাধের শাস্তি এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।