নিউইয়র্কে ৯টি বাড়ি, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সোবহান গোলাপের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা
নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে আলোচনায় সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সোবহান গোলাপ। তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন
বাংলাদেশের সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এক সাবেক সংসদ সদস্যের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি হলেন আব্দুস সোবহান মিয়া, যিনি গোলাপ নামে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
বিষয়টি প্রথম বড়ভাবে সামনে আসে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংস্থা ওসিসিআরপি এক প্রতিবেদনে জানায়, গোলাপ নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় অন্তত ৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এসব সম্পত্তি কেনা হয়। সে সময় এগুলোর মোট মূল্য ছিল ৪০ লাখ ডলারের বেশি।
ওসিসিআরপির অনুসন্ধান অনুযায়ী, গোলাপ একসময় নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালানো, পিৎজা তৈরি এবং ওষুধের দোকানে কাজ করার মতো বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাদারীপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নিউইয়র্কে সম্পত্তি কেনার সময় তাঁর আয়ের উৎস ও সম্পদের বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে সংসদ সদস্য হওয়ার সময় জমা দেওয়া সম্পদের বিবরণীতে নিউইয়র্কের এসব সম্পত্তির তথ্য উল্লেখ না থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এসব সম্পত্তি কেনার অর্থের উৎস নিয়ে ওঠা প্রশ্নের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। এই অনুসন্ধান প্রকাশের পর বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিষয়টি নিয়ে আদালতে আবেদন করা হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, আব্দুস সোবহান গোলাপের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর নামে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ৫১টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৯৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাঁর ৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৩২ কোটি টাকা বলে কমিশন উল্লেখ করে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্বে থাকার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন করেছেন। কমিশন আরও জানায়, তাঁর মোট সম্পদের একটি বড় অংশের বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার একটি আদালত গোলাপ, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং ৫৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পত্তিগুলোর বিষয়টিও ওই আদেশের আওতায় আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিদেশে সম্পদ অর্জন, সম্পদের উৎস এবং অর্থ দেশের বাইরে নেওয়ার নিয়ম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব কতটা স্বচ্ছ, বিদেশে কেনা সম্পত্তির অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং সেসব সম্পদের তথ্য যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বা তদন্তের অভিযোগ মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা এবং দায় নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে উল্লেখ করা আইনগত ও সাংবাদিকতার দিক থেকে সঠিক হবে না।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।