বিবিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা, খারিজের আশঙ্কায় আদালতের কড়া নির্দেশ
প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে ব্যর্থ হলে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করা মামলাটি খারিজ হতে পারে, আদালতের নতুন নির্দেশে বাড়ছে আইনি চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসির বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। মামলার তদন্তপর্বে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে আদালত ট্রাম্পের আইনজীবীদের আরও তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতের নির্দেশ পালন না করলে মামলাটি খারিজসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত মামলাটি খারিজ হয়েছে, এমন কোনো তথ্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে প্রাসঙ্গিক নথি সরবরাহ এবং জবানবন্দি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। গত ২১ অক্টোবরের মধ্যে বিরোধপূর্ণ নয়, এমন প্রাসঙ্গিক নথি জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আইনজীবীদের জমা দেওয়া নথির পরিমাণ ও সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারক এনজোলিকে লেটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মাত্র ২০টি নথি জমা দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর সবই আগে বিবিসির পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল অথবা ইন্টারনেট থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারকের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, ট্রাম্পের আইনজীবীরা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে খুঁজেছেন কি না। মানহানির মামলায় অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ এবং ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রাসঙ্গিক নথি জমা না দিলে বিবিসির পক্ষে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুত করা কঠিন হতে পারে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হলে মামলার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের দাবির বিচারিক মূল্যায়নও প্রভাবিত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত ট্রাম্পের আইনজীবীদের ৫ নভেম্বরের মধ্যে কোন কোন নথি খোঁজা হয়েছে এবং কী কী নথি জমা দেওয়া হয়েছে, তার একটি তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, এখনো জমা না দেওয়া প্রাসঙ্গিক নথি ২৩ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। বিচারকের নির্দেশে স্পষ্ট করা হয়েছে, এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে মামলাটি খারিজসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করা হতে পারে। অর্থাৎ, ২১ অক্টোবরের সময়সীমা পার হওয়ার পরও নথি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি; বরং আদালত নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করে বিষয়টি আরও কঠোরভাবে দেখছেন।
নথি সরবরাহের পাশাপাশি ট্রাম্পকে জবানবন্দি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক এনজোলিকে লেট ট্রাম্পকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিবিসির আইনজীবীদের প্রশ্নের উত্তর শপথের অধীনে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ১৬ অক্টোবর জবানবন্দি দেওয়ার একটি তারিখ নির্ধারিত থাকলেও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তা বাতিল করা হয়। তাঁর আইনজীবীরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, বিবিসির আইনজীবীদের দাবি, ওই দিন ট্রাম্প জর্জিয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
আদালত আরও জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ে জবানবন্দি না দিলে মামলাটি খারিজ হওয়াসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যদি না মামলার সময়সূচি যথাযথভাবে পরিবর্তন করা হয়। মামলার নথি ও প্রমাণ বিনিময়ের বর্তমান সময়সীমা ১৮ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। জবানবন্দির মাধ্যমে বিবিসির আইনজীবীরা ট্রাম্পের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ দাবি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন। জবানবন্দি ভিডিওতে ধারণ করার অনুমতিও দিয়েছেন বিচারক, তবে তা আইনজীবীদের ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে; জনসমক্ষে প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বিবিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মামলার সূত্রপাত ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে হামলার আগে তাঁর দেওয়া ভাষণের সম্পাদিত অংশ নিয়ে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিবিসির ‘প্যানোরামা’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে ভাষণের পৃথক অংশ জুড়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে মনে হতে পারে ট্রাম্প সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিবিসি স্বীকার করেছে, সম্পাদনার ফলে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হয়েছিল এবং এ জন্য ক্ষমাও চেয়েছে। তবে সম্প্রচারমাধ্যমটি ট্রাম্পের মানহানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্পের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষণ সম্পাদনা করে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাঁর সুনাম নষ্ট করা হয়েছে। এ কারণে তিনি অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। বিবিসির বক্তব্য, সম্পাদনায় ভুল ছিল, কিন্তু সেই ভুলের জন্য আইনগতভাবে মানহানির দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই পার্থক্যই মামলার অন্যতম প্রধান বিতর্ক।
মামলায় ক্ষতির পরিমাণ যাচাইয়ের জন্য ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-আ-লাগো ক্লাবের সদস্যপদসংক্রান্ত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালত ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সদস্যপদের আবেদনসংখ্যা এবং নতুন সদস্যদের প্রবেশমূল্য ও সদস্যপদ ফি-সংক্রান্ত তথ্য বিবিসিকে দেখার অনুমতি দিয়েছেন। বিবিসির আইনজীবীদের যুক্তি, এসব তথ্য ট্রাম্পের সুনাম ও আর্থিক ক্ষতির দাবির মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে। ট্রাম্পের আইনজীবীরা অবশ্য এসব তথ্য চাওয়ার ব্যাপ্তি ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
মামলাটি শেষ পর্যন্ত খারিজ হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আদালতের নির্দেশ মানা, প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ এবং জবানবন্দি দেওয়ার বিষয়গুলো পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্পের পক্ষের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি; একইভাবে বিবিসির সম্পাদনাগত ভুল স্বীকার করাও নিজে থেকে মানহানির আইনি দায় প্রমাণ করে না। ফলে মামলার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে প্রমাণ, আদালতের নির্দেশ পালন এবং উভয় পক্ষের যুক্তির বিচারিক মূল্যায়নের ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।