ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বৃদ্ধি, ইউরেনিয়াম নিয়ে অনড় তেহরান, নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে
কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পেয়েছে ইরান; তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, অবরোধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের একটি নতুন প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছেছে। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। অন্যদিকে, ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের কাছে নতুন সমঝোতা প্রস্তাব পৌঁছেছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবটির লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধের পথ তৈরি করা এবং দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা। তবে প্রস্তাবের সব শর্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তেহরানের কাছে পৌঁছানো প্রস্তাবের বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য নয়। পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে ইরান আপস করতে প্রস্তুত নয় বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে তিনটি শর্ত দিয়েছে। শর্তগুলো হলো, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর, আঞ্চলিক সামরিক অভিযান বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত রাখা। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর বরাত দিয়ে দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।
তবে এই তিনটি শর্তকে একত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এবং প্রচারিত দাবির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। দেশটি পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারও বজায় রাখতে চায়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক উপাদানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংস্থাটি আগে জানিয়েছিল, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুত ছিল। তবে সামরিক হামলার পর থেকে এসব উপাদানের বর্তমান অবস্থার পূর্ণ যাচাই সম্ভব হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত থাকা মানেই কোনো দেশ ইতিমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে, এমন নয়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ ও যাচাই প্রয়োজন।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পরিবহনের জন্য এই সামুদ্রিক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং তেলের দাম প্রভাবিত হতে পারে। ফলে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানে আবার হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হবে এমন দাবির পক্ষে নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এবং চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সমঝোতার পথে প্রধান বাধা হচ্ছে দুই পক্ষের ভিন্ন অগ্রাধিকার। যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চয়তা চাইছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ বন্ধ, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং অবরোধসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সমাধানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। উভয় পক্ষের শর্তের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে কূটনৈতিক আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন প্রস্তাব এবং ইরানের আপত্তির বিষয়টি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কথিত চূড়ান্ত সতর্কবার্তার সব শর্ত এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। একইভাবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন যৌথ হামলা শুরু হওয়ার দাবিকেও নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনা, দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। এখন পর্যন্ত নতুন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।