প্রথম প্রান্তিকেই রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, চাপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, ঘাটতি প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, বাড়ছে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ।
বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। তবে এই হিসাবের পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবরণী স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় একেবারে কমে যায়নি, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দুর্বল।
রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম আলোচিত কারণ হলো মূল্য সংযোজন করের বিবরণী জমা দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তন। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর বিবরণী জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান জুলাই ও আগস্ট মাসে বিবরণী জমা দেয়নি এবং সেপ্টেম্বর মাসে মূল্য সংযোজন কর আদায়ে প্রভাব পড়ে। পরে সরকার আবার মাসিক বিবরণী জমা দেওয়ার নিয়ম ফিরিয়ে আনে। তবে এই পরিবর্তনই পুরো ঘাটতির কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যে রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ে তৎপরতার অভাব এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথগতির কথাও উঠে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমতে পারে, আমদানি হ্রাস পেলে শুল্ক আদায়ে প্রভাব পড়তে পারে এবং করযোগ্য আয় কমে যেতে পারে। এসব বিষয় রাজস্ব আদায়কে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রতিটি কারণের অবদান নির্ধারণের জন্য খাতভিত্তিক সরকারি হিসাব প্রয়োজন।
রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো সরকারি ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা। সরকারের আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজেটের ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পেলে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে পারে এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাব; বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির কারণে ইতিমধ্যে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা আলাদা হিসাব ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে গবেষণা ও নীতি সমন্বয়বিষয়ক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ দীন ইসলামের বক্তব্যে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে গেলে রাজস্ব আদায়ও দুর্বল হয়। আবার রাজস্বের অভাবে সরকারি ব্যয় সীমিত হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অর্থনীতির শ্লথগতি ও রাজস্ব ঘাটতি একে অপরকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্য সংযোজন করের বিবরণী জমার নিয়ম পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি এবং রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে পরিবর্তিত নিয়মের পূর্ণ প্রভাব বোঝার জন্য পরবর্তী মাসগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে বেশি অর্থ সংরক্ষণের ফলে মুনাফা কমে গেলে তাদের আয়কর জমার পরিমাণেও প্রভাব পড়তে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম তিন মাসের ঘাটতি পূরণ করতে হলে পরবর্তী নয় মাসে রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়াতে হবে। তবে শুধু আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, করদাতাদের সেবা সহজ করা, তথ্যভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো এবং রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরকারি পরিসংখ্যান পাতায় সর্বশেষ দৃশ্যমান তথ্যের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন মাস পর্যন্ত সাময়িক হিসাব রয়েছে। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এই যাচাইয়ের সময় পাওয়া যায়নি। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংখ্যাগুলোকে সরকারি হিসাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মেলানো সম্ভব হয়নি।
প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির তথ্য দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তবে ঘাটতির প্রকৃত কারণ, বিভিন্ন খাতের অবদান এবং অর্থবছর শেষে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে সরকারি তথ্য প্রকাশ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের পর পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।