মাথায় আঘাতের পর মস্তিষ্কের ক্ষতি বুঝতে নতুন যন্ত্র তৈরি করছেন মার্কিন গবেষক
৯,৭৫৭ বার পড়া হয়েছে ৫ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে মাথায় গুরুতর আঘাতের পর মস্তিষ্কের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে নতুন ধরনের পরিধানযোগ্য যন্ত্র তৈরির গবেষণা শুরু করছেন প্রকৌশলী ইয়াসের খান। ত্বকে লাগানো যায় এমন একটি ক্ষুদ্র যন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় সংকেত এবং প্রদাহ ও স্নায়ুকোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করেছেন তিনি। এই গবেষণার লক্ষ্য হলো, প্রচলিত পরীক্ষায় একবারে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত ধারণা পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণাটির জন্য খান ২০২৬ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা উন্নত গবেষণা প্রকল্প সংস্থার তরুণ শিক্ষক পুরস্কার পেয়েছেন। সংস্থাটির প্রকাশিত পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকাতেও তাঁর নাম এবং গবেষণার শিরোনাম রয়েছে। মাথায় আঘাতের পর মস্তিষ্কের ক্ষতি শনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা, স্নায়বিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মস্তিষ্কের চিত্রধারণ পরীক্ষার সহায়তা নেন। কম্পিউটারনির্ভর স্তরভিত্তিক চিত্রধারণ ও চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণ মস্তিষ্কের ভেতরের গঠন, রক্তক্ষরণ এবং অন্যান্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এসব পরীক্ষায় পাওয়া ছবি নির্দিষ্ট সময়ের অবস্থা তুলে ধরে। আঘাতের পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনে শরীরে কী পরিবর্তন ঘটছে, তা শুধু একটি ছবির মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা সব সময় সম্ভব হয় না। এই সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় খান এমন একটি যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যা শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে একাধিক ধরনের সংকেত সংগ্রহ করতে পারবে। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কে আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এটি এখনো গবেষণাধীন প্রযুক্তি। রোগীর ওপর এর কার্যকারিতা, নির্ভুলতা এবং চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। খান যুক্তরাষ্ট্রের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ও প্রযুক্তিবিষয়ক যৌথ উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর গবেষণাগারে নমনীয় বৈদ্যুতিক উপাদান, শরীরে পরিধানযোগ্য সংবেদক এবং শরীরের ভেতরে ব্যবহারযোগ্য ক্ষুদ্র যন্ত্র তৈরি নিয়ে কাজ হয়। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন সংকেত সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নতুন প্রকল্পটির নামের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, শরীরের কোষের মধ্যবর্তী তরলভিত্তিক বহু সংকেত সংগ্রহকারী এমন একটি ক্ষুদ্র পট্টি, যা মানসিক চাপের মাত্রা নিরূপণ ও স্নায়বিক ক্ষতির পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে। এখানে কোষের মধ্যবর্তী তরল বলতে শরীরের কোষগুলোর চারপাশে থাকা তরলকে বোঝানো হয়েছে। এই তরলে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে, যেগুলো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিংবা আঘাতের পর পরিবর্তিত হতে পারে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তিকে আরও ক্ষুদ্র করা। এর পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় সংকেতও সংগ্রহ করা হবে। গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই ধরনের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে রোগীর অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে আরও সমন্বিত ধারণা পাওয়া যেতে পারে। মাথায় আঘাতের পর শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে মস্তিষ্কের ভেতরের সব পরিবর্তন বোঝা কঠিন। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরীক্ষায় গুরুতর অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট না হলেও পরে উপসর্গ দেখা দিতে পারে বা অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। আবার আঘাতের মাত্রা, রোগীর বয়স, পূর্ববর্তী শারীরিক অবস্থা এবং আঘাতের ধরন অনুযায়ী সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। এ কারণে চিকিৎসার সময় রোগীর অবস্থা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। খানের প্রস্তাবিত যন্ত্রটি ভবিষ্যতে এমন পর্যবেক্ষণকে সহায়তা করতে পারে। শরীরের সংকেতের সঙ্গে রাসায়নিক পরিবর্তনের তথ্য মিলিয়ে দেখা গেলে চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পেতে পারেন। কোনো নির্দিষ্ট সংকেতের পরিবর্তন প্রদাহ কিংবা স্নায়বিক ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা যাচাই করাও গবেষণার অংশ হতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শরীরের কোনো রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন দেখা গেলেই যে মস্তিষ্কে নিশ্চিতভাবে ক্ষতি হয়েছে, তা বলা যায় না। একইভাবে মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক সংকেতও একাধিক কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এসব তথ্যের ব্যাখ্যার জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত যন্ত্রটি প্রচলিত চিকিৎসা পরীক্ষার বিকল্প হয়ে উঠবে কি না, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির জন্য প্রাথমিক দুই বছরের গবেষণা পর্যায়ে প্রায় সাত লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়ন নির্ধারিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এক বছরের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে মোট অর্থায়ন প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থায়নের পরিমাণ গবেষণার অগ্রগতি ও নির্ধারিত শর্তের ওপর নির্ভরশীল। এই গবেষণায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রকৌশলকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ু শল্যচিকিৎসক চার্লস লিউ ও ড্যারিন লি প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ চিকিৎসাগত যাচাই এবং রোগীর ওপর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের পরীক্ষা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ গবেষণাটি এখনই সাধারণ রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। প্রকল্পটির আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, ভবিষ্যতে হাসপাতালে থাকার বাইরেও রোগীর শারীরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। মাথায় আঘাতের পর সুস্থ হতে অনেকের দীর্ঘ সময় লাগে। চিকিৎসার অগ্রগতি, প্রদাহের পরিবর্তন কিংবা শরীরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাওয়া গেলে চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা মূল্যায়নে বাড়তি সহায়তা পেতে পারেন। তবে বাড়িতে ব্যবহারের উপযোগিতা, যন্ত্রটির নির্ভরযোগ্যতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন হবে। খানের আগের গবেষণাগুলোতেও শরীরের সঙ্গে মানানসই নমনীয় সংবেদক এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ক্ষুদ্র প্রযুক্তি তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর গবেষণাগারের কাজের মধ্যে শরীরের তরল থেকে রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করা এবং ত্বকে লাগানো যায় এমন যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টাও রয়েছে। নতুন প্রকল্পটি সেই গবেষণার ধারাবাহিকতায় মস্তিষ্কে আঘাতের পরবর্তী পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। মাথায় আঘাতের চিকিৎসায় সময়মতো বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যন্ত্রটি কতটা নির্ভুলভাবে রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করতে পারবে, বিভিন্ন রোগীর ক্ষেত্রে ফলাফল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সেই তথ্য চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে বাস্তবে কতটা সহায়ক হবে, তা ভবিষ্যৎ পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।