চীনের নতুন প্রস্তাবে ৪০টি প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বাড়তে পারে বিশ্ব প্রতিযোগিতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও সৌরবিদ্যুতের ৪০টি প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন, বাড়ছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা।
চীনের প্রযুক্তি খাতে নতুন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের মোট ৪০টি প্রযুক্তিকে রপ্তানি নিষিদ্ধ বা সীমিত করার তালিকায় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির সরকার। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে। তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত নিয়মে পরিণত হয়নি।
প্রস্তাবিত তালিকার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ২৩টি প্রযুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম বুদ্ধিমান ব্যবস্থা এবং বৃহৎ কম্পিউটিং অবকাঠামো। এসব প্রযুক্তি আধুনিক প্রযুক্তিশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলোর সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যার সমাধান এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সেবা পরিচালনা করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে, লেখা তৈরি করতে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে এবং বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, বুদ্ধিমান ব্যবস্থা নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসারে একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম। এসব প্রযুক্তির উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ তথ্য, শক্তিশালী কম্পিউটার এবং উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। ফলে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ শুধু ব্যবসায়িক বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবেদনশীল বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তাই প্রযুক্তি রপ্তানির নিয়ম সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশটির সরকার বলেছে, এটি প্রযুক্তি বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মিত কার্যক্রম এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
জীবপ্রযুক্তি খাতেও নতুন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রয়েছে। এই খাতে কোষ ও জিনভিত্তিক চিকিৎসা, ক্ষুদ্র আরএনএভিত্তিক ওষুধ এবং কিছু সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা, নতুন ওষুধ তৈরি এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নত জীবপ্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ফলে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম অনুসরণের প্রয়োজন হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রযুক্তিও প্রস্তাবিত তালিকার অংশ। এর মধ্যে বহুস্ফটিক সিলিকন উৎপাদন, সিলিকন পাত তৈরির প্রক্রিয়া এবং ব্যাটারি উৎপাদনসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় এ খাতের নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই প্রস্তাবের কারণে সৌরবিদ্যুতের দাম বাড়বে কিংবা বিশ্ববাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই।
নতুন প্রস্তাবের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বিদেশে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত নির্দিষ্ট প্রযুক্তির বিদেশমুখী হস্তান্তর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য জানাতে হতে পারে। প্রযুক্তির মালিকানা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর, বিদেশে ব্যবহারের অনুমতি প্রদান এবং মালিকানা পরিবর্তনের মতো বিষয় এ ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
তবে সব প্রযুক্তি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। চীনের প্রস্তাবে ইতিমধ্যে উন্মুক্ত উৎসে প্রকাশিত বা গবেষণাপত্রের মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রযুক্তির অনলাইন সেবা, ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন কিংবা সফটওয়্যারভিত্তিক সেবার মাধ্যমে ব্যবহার এবং সরাসরি প্রযুক্তি বিদেশে হস্তান্তরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও চীনের সব প্রযুক্তিসেবা আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা কয়েক বছর ধরেই চলছে। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত কম্পিউটার চিপ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি চীনে সরবরাহের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে চীন নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই দেশই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে দুই দেশের নীতির উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের ক্ষেত্র এক নয়।
চীনের নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রযুক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদন, নিবন্ধন ও নিয়ম মানার প্রয়োজন হতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি উন্নয়নকারী সংস্থাগুলোকে তখন সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ অনুযায়ী নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত তালিকায় কোন প্রযুক্তি থাকবে এবং কী ধরনের শর্ত আরোপ করা হবে তার ওপর।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দৈনন্দিন বিভিন্ন সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই প্রস্তাবের ফলে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেবা বন্ধ হয়ে যাবে—এমন কোনো তথ্য নেই। বরং প্রযুক্তির মালিকানা, সংবেদনশীল প্রযুক্তি বিদেশে স্থানান্তর এবং নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণে জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে পারে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর হওয়ার নিয়ম প্রকাশিত হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের কার্যক্রম সেই অনুযায়ী সাজাতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও সৌরবিদ্যুতের মোট ৪০টি প্রযুক্তি নিয়ে চীনের নতুন প্রস্তাব আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এটি এখনো প্রস্তাবিত ব্যবস্থা। এর বাস্তব প্রভাব বুঝতে চূড়ান্ত নিয়ম, প্রযুক্তির তালিকা এবং বাস্তবায়নের শর্ত প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।





