এম্পায়ার স্টেট ভবনে ওঠা রুশ যুগলের মামলায় সমঝোতার আভাস, আদালতে হাজিরা ১২ নভেম্বর
৭,৫৪৮ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
নিউইয়র্কের বিখ্যাত এম্পায়ার স্টেট ভবনের চূড়ায় উঠে বাগদানের ঘটনা ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসা রুশ যুগল অ্যাঞ্জেলিনা নিকোলাউ ও ইভান কুজনেতসভের ফৌজদারি মামলায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ম্যানহাটনের আদালতে সংক্ষিপ্ত হাজিরার পর তাঁদের আইনজীবী জানিয়েছেন, সরকারি কৌঁসুলিদের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। আগামী ১২ নভেম্বর তাঁদের আবার আদালতে হাজির হতে হবে। ওই দিনের শুনানিতে রুশ ভাষার দোভাষীর ব্যবস্থাও চেয়েছেন তাঁরা। ঘটনাটির শুরু গত ১ জুলাই। সেদিন নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী এম্পায়ার স্টেট ভবনের সর্বোচ্চ অংশে উঠে পড়েন এই যুগল। তাঁদের এই দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের পেছনে ছিল প্রেম, বাগদান এবং নিজেদের পরিচিতি আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। ভবনের চূড়ায় পৌঁছে তাঁরা শান্তি ও ভালোবাসার বার্তাসংবলিত একটি ব্যানার মেলে ধরেন। এরপর ইভান হাঁটু গেড়ে বসে অ্যাঞ্জেলিনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন বলে প্রকাশিত সংবাদ ও ভিডিওতে দেখা যায়। ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে রোমান্টিক মুহূর্তের আড়ালে ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের গুরুতর অভিযোগও সামনে আসে। যুগলটির নাম অ্যাঞ্জেলিনা নিকোলাউ ও ইভান কুজনেতসভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাঞ্জেলিনা নিকোলাউ অ্যাঞ্জেলা এবং ইভান কুজনেতসভ ইভান বেয়ারকুস নামেও পরিচিত। তাঁরা রাশিয়ার নাগরিক এবং নিউ জার্সির ইস্ট অরেঞ্জ এলাকায় বসবাস করতেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। উঁচু ভবন, সুউচ্চ স্থাপনা ও বিপজ্জনক স্থানে উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণের জন্য তাঁদের আগে থেকেই পরিচিতি ছিল। তাঁদের এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সাধারণভাবে ভবনের ছাদ বা চূড়ায় অনুমতি ছাড়া ওঠার প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র ‘স্কাইওয়াকার্স: আ লাভ স্টোরি’তেও তাঁদের দেখা গেছে। সেই তথ্যচিত্রে বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবনে তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান তুলে ধরা হয়েছিল।
জুলাইয়ের ঘটনায় তদন্তকারীদের অভিযোগ, যুগলটি ভবনের সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত অংশের বাইরে প্রবেশ করে সম্প্রচার অ্যান্টেনার দিকে উঠে গিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা আগের রাতেই ভবনের ভেতরে গোপনে অবস্থান করেছিলেন কি না, তা নিয়েও তদন্ত হয়েছিল। অভিযোগে আরও বলা হয়, ভবনের ১০২তম তলার কাছাকাছি একটি নিরাপত্তা দরজা দিয়ে তাঁরা নিষিদ্ধ অংশে প্রবেশ করেন। দরজার তালা ভাঙার অভিযোগও তদন্তের অংশ ছিল। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়; এগুলো মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঘটনার সময় ভবনের সর্বোচ্চ অংশে তাঁদের উপস্থিতি নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের কাছে নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত দড়ি বা বিশেষ সুরক্ষাসামগ্রী ছিল না। তাঁদের নিরাপদে নামিয়ে আনতে পুলিশকে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। অ্যান্টেনার বিদ্যুৎব্যবস্থা বন্ধ করার প্রয়োজন হয়েছিল বলেও তদন্তকারীদের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের অভিযান শুধু অংশগ্রহণকারীদের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে না; উদ্ধারকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী এবং ভবনের অন্যান্য কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি, চুরির উদ্দেশ্যে অবৈধ প্রবেশ, সম্পত্তির ক্ষতিসাধনসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়। পাশাপাশি নিষিদ্ধ স্থানে অনধিকার প্রবেশ, অপরাধে ব্যবহারের সরঞ্জাম রাখার অভিযোগ এবং অন্যান্য স্থানীয় আইন লঙ্ঘনের বিষয়ও মামলায় এসেছে। অভিযোগগুলোর প্রকৃতি গুরুতর হলেও, প্রতিটি অভিযোগের আইনি ভিত্তি ও প্রমাণ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের জামিনের পরিবর্তে আদালতের তত্ত্বাবধানে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। মামলার শুরু থেকেই প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা অভিযোগের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ঘটনাটিকে যেভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অতিরঞ্জিত। যুগলটির পক্ষ থেকে এই অভিযানকে শিল্পধর্মী কর্মকাণ্ড ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা অতিক্রম করে নিষিদ্ধ স্থানে ওঠার অভিযোগকে কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনো কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেলেই তা আইনসম্মত হয়ে যায় না। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেই তাঁদের অপরাধী বলে ধরে নেওয়া যায় না। আদালতের সিদ্ধান্তই মামলার পরিণতি নির্ধারণ করবে। চলতি বছরের ২৪ আগস্টও যুগলটি আদালতে হাজির হয়েছিলেন। সেই শুনানির পর তাঁদের হাতে হাত রেখে আদালত থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের সামনে তাঁরা চুম্বনও করেন। তাঁদের পোশাক, আচরণ এবং বাগদানের আংটি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ওই সময় মামলার শুনানি সংক্ষিপ্ত ছিল এবং পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আবার পিছিয়ে যায় এবং অক্টোবরের শেষ দিকে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনার বিষয়টি সামনে আসে। ২৭ অক্টোবরের শুনানিতে তাঁদের আইনজীবী নোয়াম বিয়ালে জানান, তাঁর মক্কেলদের সঙ্গে সরকারি কৌঁসুলিদের আলোচনা এগিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে দুটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে এবং সম্ভাব্য সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে কাজ চলছে। এ ধরনের সমঝোতা সাধারণত আদালতে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তির পথ তৈরি করতে পারে। তবে এই মামলায় ঠিক কী শর্তে সমঝোতা হতে পারে, কোন অভিযোগ বহাল থাকবে, কোনো অভিযোগ বাদ পড়বে কি না, কিংবা অভিযুক্তদের কী ধরনের শাস্তি হতে পারে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। আইনজীবীর আশাবাদকে তাই চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুগলটির নিয়মিত তত্ত্বাবধানসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করা হয়েছে। ২৭ অক্টোবরের শুনানিতে বিচারক তাঁদের প্রতি মাসে তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তার কাছে হাজিরা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ মামলা বাতিল হয়ে যাওয়া নয়, অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়াও নয়। আদালতের তত্ত্বাবধানের একটি শর্ত তুলে নেওয়া এবং ফৌজদারি অভিযোগের নিষ্পত্তি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের পরিণতি নির্ধারণের জন্য পরবর্তী আদালত-প্রক্রিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১২ নভেম্বরের শুনানিতে রুশ ভাষার দোভাষী চাওয়ার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। আদালতের কার্যক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন অভিযোগ, আইনজীবীর বক্তব্য এবং বিচারকের নির্দেশ যথাযথভাবে বুঝতে পারেন, সে জন্য ভাষাগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে দোভাষীর অনুরোধ থেকে তাঁদের আইনি অবস্থান বা সম্ভাব্য সমঝোতার শর্ত সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পরবর্তী শুনানিতে সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, বিচারককে নতুন কোনো প্রস্তাব দেওয়া হবে কি না এবং মামলার পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা স্পষ্ট হতে পারে। এই ঘটনাটি আবারও উঁচু ভবনে অনুমতি ছাড়া ওঠার ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃসাহসিক ছবি বা ভিডিও দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থা অতিক্রম করে এমন অভিযান চালালে প্রাণহানি, উদ্ধারকাজে জটিলতা এবং সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এম্পায়ার স্টেট ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার চূড়ায় ওঠার জন্য নির্ধারিত অনুমতি ও নিরাপত্তাবিধি রয়েছে। সেসব নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত বা প্রচারণামূলক উদ্দেশ্যে অভিযান চালানোর পরিণতি শুধু সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না; আইনি জবাবদিহিও তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।