পথচারীর সাহসে অপহরণচেষ্টা থেকে প্রাণে বাঁচল সাত বছরের শিশু নিরাপদ
৫,২৩৩ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
আলেসিয়া সুইজকোস্কি ও স্কট ভ্যান লুভেনের সাহসী ভূমিকার কথা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট, মিশিগানের স্টার্লিং হাইটস শহরের ক্লিনটন রিভার পার্ক নর্থ এলাকায়। শিশুটিকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার খালা আহত হন। অভিযুক্তকে আটক করার পর পুলিশ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাহসিকতার স্বীকৃতিও দেয়। মিশিগানের একটি পার্কে দিনের আলোয় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। একটি সাধারণ বিকেল মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। সাত বছরের একটি শিশু সাইকেল চালাচ্ছিল। তার কাছেই ছিলেন তার খালা আলেসিয়া সুইজকোস্কি ও খালার আট বছরের ছেলে। হঠাৎ একটি গাড়ি এসে তাদের কাছাকাছি থামে। এরপর যা ঘটে, তা প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে ছিল ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে শিশুটির দিকে এগিয়ে যান। তিনি শিশুটিকে সাইকেল থেকে তুলে নিজের গাড়িতে নিয়ে যান। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য পরিবারের সদস্যদের হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। কিন্তু আলেসিয়া বুঝতে পারেন, এক মুহূর্ত দেরি করলেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির পিছু নেন।
তখন আলেসিয়া রোলার স্কেট পরে ছিলেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমন অবস্থায় চলন্ত গাড়ির কাছে ছুটে যাওয়া বিপজ্জনক। কিন্তু নিজের ভাগনিকে বাঁচানোর তাগিদে তিনি আর পরিস্থিতির ঝুঁকি নিয়ে ভাবার সময় পাননি। তিনি গাড়ির চালকের পাশের জানালা দিয়ে শরীরের ওপরের অংশ ভেতরে ঢুকিয়ে চালকের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করেন। তার লক্ষ্য ছিল একটাই—গাড়িটি যেন শিশুটিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া আলেসিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি কখনো সামনে, কখনো পেছনে গাড়ি চালিয়ে আলেসিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় আলেসিয়া আঘাত পান। তবুও তিনি গাড়ির নিয়ন্ত্রণে থাকা চাকার ওপর নিজের হাত রাখেন এবং শিশুটিকে ছেড়ে দিতে অভিযুক্তকে বাধা দিতে থাকেন। শিশুটিকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যও তিনি বারবার উৎসাহ দেন। এই সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। স্কট ভ্যান লুভেন নামে এক ব্যক্তি ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি গাড়ির জানালায় ঝুলে থাকা আলেসিয়াকে দেখতে পান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি নিজের গাড়ি ঘুরিয়ে অভিযুক্তের গাড়ির সামনে অবস্থান নেন। ফলে গাড়িটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার পথ আটকে যায়। স্কট শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখেননি। তিনি গাড়ির কাছে গিয়ে অভিযুক্তকে বাইরে বের করে আনেন এবং পুলিশ আসা পর্যন্ত তাকে আটকে রাখেন। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। স্কটের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ শিশুটিকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ঘটনাটির মধ্যে আরও একটি বেদনাদায়ক দিক ছিল। আলেসিয়ার আট বছরের ছেলেও তার ছোট্ট কাজিনকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তের গাড়ির ধাক্কায় ছেলেটি আহত হয়। সংবাদমাধ্যম জানায়, তার আঘাত গুরুতর ছিল না এবং সে সুস্থ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, শিশুটিকে উদ্ধার করার এই প্রচেষ্টায় পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। শিশুটির মা ও পরিবারের সদস্যদের জন্য ঘটনাটি ছিল গভীর মানসিক আঘাতের। মেয়েটি নিরাপদে ফিরে এলেও এমন অভিজ্ঞতার পর আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সহজ ছিল না। পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পর পার্কে যাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছিল। তাঁরা মানসিকভাবে পরিস্থিতি সামলে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যে শুধু ঘটনার মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পরিবারের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ। ঘটনার পর স্কট ভ্যান লুভেনকে স্থানীয়ভাবে সাহসী নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি স্টার্লিং হাইটস পুলিশের স্বেচ্ছাসেবী নাগরিক টহল দলের সদস্য ছিলেন। এই দলের সদস্যরা পুলিশকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন এবং নিজেদের এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। তবে ওই সময় স্কট নিয়মিত টহলে ছিলেন না; কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঘটনাটি তাঁর চোখে পড়ে। তিনি সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেন। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্টার্লিং হাইটসের নগর পরিষদ ও পুলিশ বিভাগ স্কটকে তাঁর ভূমিকার জন্য সম্মানিত করে। তাঁকে ‘নাইস নেবার অ্যাওয়ার্ড’ নামে প্রতিবেশীসুলভ অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে আলেসিয়া, তাঁর ছেলে এবং উদ্ধার হওয়া শিশুকেও তাঁদের সাহসিকতার জন্য সম্মান জানানো হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনাটি ছিল এমন একটি উদাহরণ, যেখানে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক সহায়তা বড় বিপদ ঠেকাতে পারে। তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, সাত বছরের শিশুটিকে তুলে নেওয়ার ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা আগে একই ব্যক্তি মিশিগানের ক্লিনটন টাউনশিপ এলাকায় ১৫ বছরের আরেকটি মেয়েকে অপহরণের চেষ্টা করেছিলেন। ওই কিশোরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তি তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে চলে যেতে চাইলে অভিযুক্ত তাঁর হাত ধরে তাঁকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন পল বিলিটার নামে আরেক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বাধা দেন। ফলে কিশোরীটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনে।
ম্যাকম্ব কাউন্টির সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাত বছরের শিশুটির ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপহরণ ও শিশুকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং মারধরের অভিযোগ আনা হয়। আগের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে আটক রাখার চেষ্টা এবং মারধরের অভিযোগও ছিল। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে দোষী বলা যায় না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত এন্ডি বালা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। ঘটনাটি থেকে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। শিশুদের বাইরে খেলতে দেওয়ার সময় বড়দের নজরদারি থাকা জরুরি। শিশুদের অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কোথাও না যাওয়া, অচেনা কারও কাছ থেকে যাতায়াতের প্রস্তাব গ্রহণ না করা এবং বিপদ অনুভব করলে জোরে সাহায্য চাওয়ার মতো বিষয় শেখানো দরকার। তবে এসব সতর্কতা শেখানোর অর্থ এই নয় যে কোনো ঘটনার জন্য শিশুকে দায়ী করা হবে। অপহরণের চেষ্টা বা জোরজবরদস্তির সম্পূর্ণ দায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরই। এ ধরনের ঘটনা দেখলে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। সরাসরি চলন্ত গাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়া বা শারীরিক সংঘর্ষে জড়ানো প্রাণঘাতী হতে পারে। সম্ভব হলে দ্রুত জরুরি সেবায় ফোন করা, আশপাশের মানুষকে সাহায্যের জন্য ডাকা, নিরাপদ দূরত্ব থেকে গাড়ির বিবরণ ও অবস্থান মনে রাখা এবং পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ পথ। স্কটের মতো কেউ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা করতে এগিয়ে এলে বিপদগ্রস্ত মানুষ উপকৃত হতে পারেন, তবে প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদা। আলেসিয়া ও স্কটের ভূমিকা এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। একজন পরিবারের সদস্যকে রক্ষা করতে নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। অন্যজন অপরিচিত একটি শিশুকে বিপদে দেখে থেমেছিলেন এবং সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের দ্রুত সিদ্ধান্তের ফলে শিশুটি পরিবারের কাছে ফিরে আসে। একই সঙ্গে শিশুটির ছোট্ট কাজিনও তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছিল—যদিও সে নিজেও আহত হয়।
এই ঘটনাকে নতুন করে ঘটেছে বলে প্রচার করা উচিত নয়। এটি ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্মাননা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আবার আলোচনায় আসে। যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, আলেসিয়া সুইজকোস্কি ও স্কট ভ্যান লুভেনের সাহসী পদক্ষেপ একটি শিশুকে সম্ভাব্য অপহরণ থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁদের কাজ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিপদে দ্রুত সহায়তা এবং শিশুদের নিরাপত্তার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।