টোকিওতে সাসাকাওয়ার নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশে টিকা কারখানা স্থাপনে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা
জাপানের টোকিওতে ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আলোচনায় উঠে এল বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা।
টোকিওতে সাসাকাওয়ার নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশে টিকা কারখানা স্থাপনে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা
৯,৬৫৪ বার পড়া হয়েছে ৫ মিনিটে পড়ুন
২৬ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার, জাপানের রাজধানী টোকিওতে নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে এক নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। নৈশভোজে দুই দেশের সম্পর্ক, বাংলাদেশের মানবিক উন্নয়ন, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা। টোকিওর মেইজি কিনেনকান ভবনের হানাগাসুমি রেস্তোরাঁয় এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং নিপ্পন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জাপান সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই আয়োজন দুই দেশের মধ্যে চলমান যোগাযোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা, শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য খাতে সাসাকাওয়ার দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। আলোচনায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বও উঠে আসে। বাংলাদেশের জন্য টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সময়মতো টিকা পাওয়া, রোগের বিস্তার কমানো এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। দেশে টিকা উৎপাদনের কারখানা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি, বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা কারখানা নির্মাণের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এটিকে বাস্তবায়িত প্রকল্প হিসেবে নয়, সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। দেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদনব্যবস্থার অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের মতো বিষয় বিবেচনা করতে হবে। টিকা উৎপাদন শুধু একটি কারখানা নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে গবেষণা, পরীক্ষাগার, সংরক্ষণব্যবস্থা, দক্ষ কর্মী এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থাও জড়িত। তাই সম্ভাব্য সহযোগিতা বাস্তবে রূপ নিতে হলে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও সমঝোতা প্রয়োজন হবে। নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এ ছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ডা. মো. শাকিরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। জাপানের পক্ষ থেকে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাকাশি আরিকাওয়া এবং সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নৈশভোজে অংশ নেন। ইয়োহেই সাসাকাওয়া দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। নিপ্পন ফাউন্ডেশন বিভিন্ন দেশে মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও মানবিক সহায়তা ও জনস্বাস্থ্য খাতে তাদের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরের সময় সাসাকাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট এবং মানবিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে টিকা উৎপাদন নিয়ে এবারের আলোচনাকে দুই পক্ষের আগের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব আরও বাড়াতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরেও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, নতুন বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। তবে নৈশভোজে আলোচিত টিকা উৎপাদন উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং উভয় পক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। জনস্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়েছে। সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেই হয় না; রোগ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, টিকা সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এগিয়ে গেলে এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি না করাও জরুরি। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নৈশভোজে টিকা উৎপাদন কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোথায় কারখানা হবে, কত অর্থ ব্যয় হবে, কোন ধরনের টিকা উৎপাদিত হবে কিংবা উৎপাদন কখন শুরু হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই আলোচনার পরবর্তী ধাপে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কারিগরি ও আর্থিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময়, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এসব প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে জাপানের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, টোকিওতে ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নৈশভোজে অংশগ্রহণ শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; আলোচনায় বাংলাদেশের মানবিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে দেশে টিকা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য সহযোগিতা ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপর।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।