সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
মূল্যস্ফীতির চাপে মার্কিন অর্থনীতি, সুদের হার নিয়ে ফেডের সিদ্ধান্ত ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তাগাজা শান্তিচুক্তিতে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের দাবি, নতুন চুক্তির সত্যতা নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নঝড় নেই, তবু ডুবছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল, অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কাসৌদির তেলপথ ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি হুতিদের, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের ঘোষণা জোটেরক্যালিফোর্নিয়ার ২০ হাজার ডাকব্যালট নিয়ে আদালতে কঠিন প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন

ঝড় নেই, তবু ডুবছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল, অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কা

ঝড় ছাড়াই ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে বাড়ছে জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের ঝুঁকি; অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার, উষ্ণ সমুদ্র এবং জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

ঝড় নেই, তবু ডুবছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল, অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কা
ঝড় নেই, তবু ডুবছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল, অস্বাভাবিক জোয়ারে বাড়ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ারের কারণে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের প্লাবনের জন্য সব সময় ঝড়, ভারী বৃষ্টি কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজন হয় না। সমুদ্রের স্বাভাবিক জোয়ার যখন বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবস্থার কারণে অনেক বেশি উচ্চতায় পৌঁছায়, তখন নিচু উপকূলীয় এলাকা, সড়ক, পার্কিংয়ের স্থান, সমুদ্রতীরবর্তী বাড়িঘর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় পানি ঢুকে পড়তে পারে। ২০২৬ সালের ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ জোয়ারের প্রভাব আরও বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে রাজ্যের একাধিক উপকূলীয় এলাকায় বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ঘটনার পেছনে রয়েছে বিশেষ ধরনের উচ্চ জোয়ার, যা সাধারণভাবে রাজকীয় জোয়ার নামে পরিচিত। এটি বছরের সবচেয়ে উঁচু পূর্বাভাসযোগ্য জোয়ারগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি প্রচলিত নাম। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক অবস্থানের কারণে সমুদ্রের পানির ওপর মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাব পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ একই রেখা বরাবর কাজ করলে জোয়ারের উচ্চতা সাধারণত বাড়তে পারে। চাঁদের কক্ষপথ এবং পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের দূরত্বও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে ক্যালিফোর্নিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু চাঁদ ও সূর্যের অবস্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি, এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত সামুদ্রিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উষ্ণ সমুদ্রের পানি প্রসারিত হয়ে আয়তনে বাড়ে। অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগে থেকেই বেড়ে গেলে একই উচ্চতার জোয়ারও আগের তুলনায় বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ মৌসুমে অস্বাভাবিক উঁচু সমুদ্রপৃষ্ঠ এবং শক্তিশালী জোয়ার একসঙ্গে কাজ করলে বাস্তব পানির উচ্চতা জোয়ারের সাধারণ পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকো উপসাগর, মন্টেরে উপসাগর এবং বিগ সুর উপকূলের কিছু নিচু এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে। এসব অঞ্চলের কোনো কোনো স্থানে ভূমির স্বাভাবিক স্তরের ওপর প্রায় ১ দশমিক ৯ ফুট, অর্থাৎ প্রায় ৫৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পানি জমতে পারে। সান ফ্রান্সিসকোর জোয়ার পরিমাপক কেন্দ্রে ২৮ অক্টোবর পানির উচ্চতা স্থানীয় পরিমাপের মানদণ্ডে প্রায় ৭ দশমিক ৭ ফুটে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই উচ্চতা সমুদ্রের নির্ধারিত পরিমাপক স্তর থেকে হিসাব করা হয়; তাই একে সব এলাকার মাটির ওপর পানির গভীরতা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। প্রকৃত প্লাবনের মাত্রা স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, উপকূলের গঠন এবং ঢেউয়ের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অরেঞ্জ ও সান দিয়েগো কাউন্টিতে ২৫ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত উপকূলীয় প্লাবনের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস, ভেনচুরা, সান্তা বারবারা এবং সান লুইস ওবিস্পো কাউন্টির উপকূলীয় এলাকাগুলোর জন্যও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। এসব অঞ্চলে উচ্চ জোয়ারের সময় সড়ক, সৈকতের পার্কিং এলাকা, হাঁটার পথ, সাইকেল চলাচলের পথ এবং নৌবন্দরের আশপাশের নিচু স্থান পানিতে ডুবে যেতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় সমুদ্রের পানি প্রবেশের কারণে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউপোর্ট বিচ ও লং বিচের মতো উপকূলীয় এলাকাগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শক্তিশালী ঢেউ ও উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে এসব অঞ্চলে সৈকত, হাঁটার পথ এবং সমুদ্রতীরবর্তী স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। নিউপোর্ট বিচের কিছু এলাকায় সমুদ্রের পানির উচ্চতা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চি বেশি থাকার কথা জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এই অতিরিক্ত উচ্চতার পেছনে উষ্ণ সমুদ্রের পানি, সামুদ্রিক ঢেউ এবং অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লং বিচের উপদ্বীপ এলাকায় সমুদ্রের ঢেউ ও ভূমিক্ষয়ের কারণে উপকূলীয় অবকাঠামোর ঝুঁকি বেড়েছে। কিছু বাড়িঘর ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও বালুর বাঁধ তৈরি, বালু সরিয়ে উপকূল রক্ষা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যবস্থা সাময়িক সুরক্ষা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় ক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্লাবন সাধারণ বন্যার তুলনায় কিছুটা আলাদা। নদীর পানি উপচে পড়া কিংবা বৃষ্টির পানি জমার পরিবর্তে এখানে সমুদ্রের পানি জোয়ারের সঙ্গে স্থলভাগে প্রবেশ করে। জোয়ার নেমে গেলে পানি কমে আসতে পারে, কিন্তু পরপর কয়েক দিন উচ্চ জোয়ার হলে একই এলাকায় বারবার প্লাবন দেখা দিতে পারে। এর ফলে সড়কের নিচের মাটি দুর্বল হয়ে যাওয়া, সৈকতের বালু সরে যাওয়া, পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা দেয়ালের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ ও স্থলভাগের বরফ গলে সমুদ্রে পানি যোগ হচ্ছে। একই সঙ্গে উষ্ণ সমুদ্রের পানি প্রসারিত হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলো আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে যে জোয়ার অতীতে কোনো ক্ষতি করত না, ভবিষ্যতে সেই একই জোয়ার নিচু এলাকা প্লাবিত করতে পারে। তবে প্রতিটি প্লাবনের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় আবহাওয়া, সমুদ্রের ঢেউ এবং জোয়ারের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আরও কয়েক দফা উল্লেখযোগ্য উচ্চ জোয়ার দেখা যেতে পারে। সম্ভাব্য সময়সূচি অনুযায়ী, ২৪ থেকে ২৬ নভেম্বর, ২৩ থেকে ২৫ ডিসেম্বর এবং ২০২৭ সালের ২১ ও ২২ জানুয়ারি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বছরের সবচেয়ে উঁচু জোয়ারের কয়েকটি পর্ব দেখা যেতে পারে। উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু স্থানে স্থানীয় সময়সূচিতে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। এসব তারিখ মূলত সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থানের ভিত্তিতে গণনা করা হয়। ঝড়, বড় ঢেউ এবং এল নিনোর কারণে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।

এ পরিস্থিতিতে উপকূলীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য প্লাবনের আগে বাড়িঘর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদে রাখা, স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করা এবং জরুরি নির্দেশনা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। পানিতে ডুবে থাকা সড়কে গাড়ি চালানো কিংবা বাধা অতিক্রম করে বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করা উচিত নয়। সমুদ্রের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছবি তোলা বা ঢেউয়ের খুব কাছে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। উচ্চ জোয়ারের সময় পানি দ্রুত বাড়তে পারে এবং সৈকত থেকে নিরাপদে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে ঝড় ছাড়াই প্লাবনের আশঙ্কা সমুদ্রের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ও পরিবর্তিত জলবায়ুগত পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবকে সামনে এনেছে। রাজকীয় জোয়ার নিজেই একটি স্বাভাবিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা, কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক উষ্ণ পানি এবং শক্তিশালী ঢেউয়ের সঙ্গে মিলিত হলে এর প্রভাব অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। তাই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।


ট্যাগ: ক্যালিফোর্নিয়াযুক্তরাষ্ট্রউপকূলীয় প্লাবনরাজকীয় জোয়ারঅস্বাভাবিক জোয়ারসমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজলবায়ু পরিবর্তনপ্রশান্ত মহাসাগরএল নিনোআবহাওয়া সতর্কতাসমুদ্রের ঢেউ

প্রতিবেদক

CSB News USA

মন্তব্য ০

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।