ক্যালিফোর্নিয়ার ২০ হাজার ডাকব্যালট নিয়ে আদালতে কঠিন প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি খতিয়ে দেখছেন আপিল আদালতের বিচারকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা করে রাখার দাবিতে আইনি চাপে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। কেন্দ্রীয় সরকারের করা জরুরি আবেদনের শুনানিতে আপিল আদালতের বিচারকেরা সরকারের আইনি ক্ষমতা, মামলার সময় নির্বাচন এবং ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই বিরোধ দেশটির নির্বাচন পরিচালনা, ভোটাধিকার এবং কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
২৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালতের তিন বিচারকের একটি প্যানেল প্রায় দুই ঘণ্টার শুনানিতে বিচার বিভাগের আবেদনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে। বিচারকেরা জানতে চান, নিম্ন আদালতে মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার আগেই আপিল আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়ার যথেষ্ট আইনি ভিত্তি রয়েছে কি না। একই সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার নিজস্ব নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত রায় দেননি ।
মার্কিন বিচার বিভাগ ১৫ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা করে। সরকারের দাবি, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে এমন ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে, যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এবং যাঁরা অঙ্গরাজ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারদের ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়। ফলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো ব্যালটের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার।
বিচার বিভাগের দাবি, যাঁদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যায়নি, তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যালট যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখতে হবে। সরকারের বক্তব্য, অযোগ্য কোনো ব্যক্তি ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দিলে তা আইনবিরোধী এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটের মূল্য ক্ষুণ্ন হতে পারে।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তালিকায় থাকা ২০ হাজার ব্যক্তির সবাই বেআইনিভাবে ভোট দিয়েছেন, এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি। নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ, ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকা এবং বাস্তবে ভোট দেওয়া এই তিনটি বিষয় এক নয়। ফলে সরকারি তালিকায় নাম থাকার ভিত্তিতে কারও ভোট বেআইনি বলে ধরে নেওয়া যায় না।
শুনানিতে বিচারক মার্ক বেনেট সরকারের আইনজীবীদের কাছে জানতে চান, নিম্ন আদালত দ্রুত শুনানি করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও আপিল আদালতের এখনই হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন কেন। তাঁর প্রশ্নের মূল বিষয় ছিল, সরকার নিজেই মামলা করার সময় নির্ধারণ করেছে; তাহলে নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে জরুরি প্রতিকার চাওয়ার দায় কেন আদালতকে নিতে হবে?
বিচারক গ্যাব্রিয়েল সানচেজও সরকারের উপস্থাপিত তথ্যের উৎস এবং তালিকা তৈরির পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোন কোন পক্ষের তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করা হয়েছে, তা নিয়ে সরকারের আইনজীবীদের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন বিচারকের প্যানেলে বিচারক প্যাট্রিক বুমাটে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উদ্বেগের দিকেও মনোযোগ দেন। তবে শুনানিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের প্রশ্ন থেকে বোঝা যায়, আবেদনটির আইনি ভিত্তি এবং আপিল আদালতের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের সরবরাহ করা তালিকায় ভুল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচনী কর্মকর্তারা তালিকার একটি অংশের প্রাথমিক পর্যালোচনায় এমন ব্যক্তিদের তথ্য পেয়েছেন, যাঁদের ভোটার নিবন্ধন বাতিল বা নিষ্ক্রিয় ছিল, যাঁদের ভোট দেওয়ার পূর্ব ইতিহাস নেই, কিংবা যাঁদের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০টি নামের একটি নমুনা পর্যালোচনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ে। তবে এই নমুনার ফলাফল দিয়ে পুরো ২০ হাজার ব্যক্তির অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে, জন্মস্থানসংক্রান্ত তথ্য একা প্রত্যেক ব্যক্তির বর্তমান নাগরিকত্ব বা ভোটদানের যোগ্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যালট আলাদা রাখা বাস্তবে জটিল হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে ব্যালট খোলা, যাচাই এবং গণনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে গেলে নির্দিষ্ট ভোটারের ব্যালট অন্যদের থেকে আলাদা করা কঠিন হতে পারে। এতে যোগ্য ভোটারদের ভোট গণনায় বিলম্ব বা ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অঙ্গরাজ্যের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নির্বাচনের নিয়ম পরিচালনার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে। তাই যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যালট আটকে রাখার আদেশ দেওয়া হলে সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
বিচার বিভাগ প্রথমে ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তাদের কাছে সন্দেহভাজন ভোটারদের তালিকা যাচাই করার দাবি জানায়। এরপর ১৫ অক্টোবর মামলা করে এবং ব্যালট গণনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আদেশ চায়। নিম্ন আদালতের বিচারক ডেভিড কার্টার ২৭ অক্টোবর শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই শুনানির আগেই বিচার বিভাগ আপিল আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ চায়।
সরকারের যুক্তি, ব্যালট গণনা চলতে থাকলে পরে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ভোট আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, অঙ্গরাজ্য বলছে, নিম্ন আদালতে তথ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই আপিল আদালতের কাছে জরুরি আদেশ চাওয়া যথাযথ নয়।
২৫ অক্টোবরের শুনানিতে আপিল আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় মামলার ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত ছিল। নিম্ন আদালতের নির্ধারিত শুনানি এবং আপিল আদালতের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত দুটিই পরবর্তী আইনি পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তাই নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটারদের যোগ্যতা নিয়ে বিরোধ রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচনে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, অযোগ্য ভোটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও যথাযথ যাচাই প্রয়োজন। সন্দেহের ভিত্তিতে যোগ্য ভোটারের ব্যালট আটকে রাখাও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এখানে দুটি স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। একদিকে নির্বাচনের বৈধতা ও ভোটের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে; অন্যদিকে যোগ্য নাগরিকদের ভোট যেন ভুল তথ্যের কারণে বাতিল বা অগণিত না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন এবং আদালতের নথি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকা ব্যক্তিদের ব্যালট যাচাই ও আলাদা রাখার দাবি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়া সেই তালিকার নির্ভরযোগ্যতা এবং সরকারের হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। আপিল আদালতের বিচারকেরা এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছেন।
তবে এখন পর্যন্ত এই মামলার শুনানিতে ২০ হাজার ব্যক্তির সবাই বেআইনিভাবে ভোট দিয়েছেন এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। একইভাবে, আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন চূড়ান্তভাবে খারিজ করেছে, এমন দাবিও করা যাবে না। বিচারকদের প্রশ্ন কোনো মামলার সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে আদালতের রায় নয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার এই মামলা শুধু কয়েক হাজার ব্যালটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে না; এটি নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা, অঙ্গরাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার এবং ভোটারদের ব্যক্তিগত অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে সন্দেহভাজন ভোটারদের ব্যালট যাচাইয়ের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকার কতটা এগোতে পারবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অঙ্গরাজ্যের কর্তৃত্ব কতটা সুরক্ষিত থাকবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।