ইরান যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে নেতানিয়াহুকে ভোট দিতে ইসরায়েলিদের প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে ইসরায়েলি ভোটারদের নেতানিয়াহুর পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশটির ভোটারদের তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, দুই দেশ যে কাজ শুরু করেছে, তা শেষ করতে হবে। ২৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ আহ্বান জানান। খবর ইরান ইন্টারন্যাশনালের।
ট্রাম্প তাঁর বার্তায় নেতানিয়াহুকে একজন অসাধারণ যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সামরিক সাফল্যের ক্ষেত্রে দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ পদক্ষেপের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া পরবর্তী সামরিক অভিযান এবং নৌ অবরোধের ফলে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এসব দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে কিংবা দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। তাই এসব বক্তব্যকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়।
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামের সামরিক অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওই হামলায় স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানায়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এমন দাবি স্বাধীন মূল্যায়নে নিশ্চিত করা যায়নি।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হলো, স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একটি দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়া এক বিষয় নয়। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পারমাণবিক অবকাঠামো এবং ভবিষ্যতে কর্মসূচি পুনরায় চালু করার সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে অবরোধের প্রকৃত প্রভাব, ইরানের তেল রপ্তানির পরিমাণ এবং অর্থনীতির ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করতে স্বাধীন তথ্য ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী হলেও তাঁর নেতৃত্ব, নিরাপত্তানীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিকেই নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা সংসদের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেন। এরপর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জনের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়। ফলে ট্রাম্পের আহ্বান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দল ও তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন ইসরায়েলের নির্বাচনী ফল নির্ধারণ করবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক নীতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেলের দাম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তিনি ইরানকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা চান। তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
নেতানিয়াহুর পক্ষে ট্রাম্পের ভোট চাওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামরিক সাফল্যের দাবি এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে সংবাদটি মূল্যায়ন করা জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।