হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে ওবামার বিস্ফোরক মন্তব্য বিশ্বজুড়ে তোলপাড়
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নামে প্রচারিত একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বক্তব্যটিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান এখন কার্যত বাধা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রচারিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইরানের এখন হরমুজ প্রণালিতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে বক্তব্যটির অর্থ সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পুরো প্রণালির মালিকানা বা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে গেছে। বরং সামরিক শক্তি এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতার মাধ্যমে ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও এই পথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা, সামরিক তৎপরতা এবং পরিবহন ঝুঁকি বৃদ্ধি। জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হয়। একই সঙ্গে জাহাজের বিমা খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে ঘাটতির আশঙ্কা করলেও তেলের দাম বাড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য পরিবর্তনের পেছনে উৎপাদন, মজুত, বৈশ্বিক চাহিদা এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর নীতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশের বাজারে প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি চুক্তি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং সরকারি জ্বালানিনীতি কতটা পরিবর্তিত হয় তার ওপর।
ওবামার বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে কূটনীতি ও সামরিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তিটির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ব্যবস্থা ছিল। পরে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে সরে যায়।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সমর্থকেরা মনে করেন, দেশটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকেরা আশঙ্কা করেন, সামরিক সংঘাতের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ইরানের প্রভাব বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মূল কারণ হলো, এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব বহু দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ এবং তারিখ যাচাই করা জরুরি। বারাক ওবামার বক্তব্যের মূল ভিডিও, সম্পূর্ণ প্রতিলিপি অথবা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সরাসরি প্রতিবেদন ছাড়া কোনো উদ্ধৃতিকে হুবহু সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে ইরানের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি এবং প্রণালির সম্পূর্ণ আইনগত নিয়ন্ত্রণ অর্জন এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হলে তা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সামরিক সংঘাতের মাত্রা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।