দ্বিতীয় সপ্তাহেই এলিজাবেথ হোমসের প্রামাণ্যচিত্রের আয় ১৯৫ লাখ ডলার, হলিউডে তুমুল আলোড়ন
বিতর্কিত উদ্যোক্তা এলিজাবেথ হোমসের জীবন নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র দ্বিতীয় সপ্তাহে আয় করেছে ১৯৫ লাখ ডলার, দর্শক আগ্রহে বাড়ছে প্রদর্শনীর পরিসর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এলিজাবেথ হোমসের জীবনকেন্দ্রিক প্রামাণ্যচিত্র ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’। মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে চলচ্চিত্রটি উত্তর আমেরিকার প্রেক্ষাগৃহে আনুমানিক ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার আয় করেছে। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এ টুয়েন্টিফোরের পরিবেশনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রের আয় প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিনোদনজগতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২৫ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে চলচ্চিত্রটির আয় প্রথম সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম সপ্তাহে সীমিত পরিসরে ৮৫৫টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হওয়ার পর দ্বিতীয় সপ্তাহে এর প্রদর্শনীর সংখ্যা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৫৫টি করা হয়। নতুন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন শুরু হওয়ায় আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে দ্বিতীয় সপ্তাহান্তের আয় প্রথম সপ্তাহান্তের প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের হিসাবকেও ছাড়িয়ে যায়।
চলচ্চিত্রটির দুই সপ্তাহের মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৫১ লাখ ডলার। চলচ্চিত্রের আয়সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার বক্স অফিস মোজো এবং দ্য নাম্বার্সেও এই হিসাবের সমর্থন পাওয়া গেছে। ফলে এটি কেবল একটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র নয়, বরং চলতি বছরের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জনকারী প্রামাণ্যচিত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এলিজাবেথ হোমস যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিষয়ক উদ্যোগের জগতে একসময় অত্যন্ত পরিচিত নাম ছিলেন। তিনি থেরানোস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠানটি অল্প পরিমাণ রক্ত ব্যবহার করে দ্রুত ও সহজে বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা করার প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই ধারণা বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তিশিল্পের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির আগ্রহ তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাপদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়া তথ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আইনি বিতর্কে রূপ নেয়। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে হোমস দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁর কারাদণ্ড হয়। তাঁর উত্থান, প্রতিষ্ঠানের বিপুল মূল্যায়ন এবং পরবর্তী পতন প্রযুক্তিশিল্পে জবাবদিহি, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও উদ্যোক্তাদের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’ নির্মাণ করেছেন নাথান ফিল্ডার ও ল্যান্স ওপেনহাইম। চলচ্চিত্রটির বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু থেরানোসের উত্থান-পতনের পুরোনো ঘটনা পুনরায় তুলে ধরে না; বরং কারাগারে যাওয়ার আগের সময়টিতে হোমসের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর চারপাশের পরিস্থিতিও অনুসন্ধান করে। নির্মাতারা হোমস ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ধারণ করেছেন।
চলচ্চিত্রটির কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে দেখা যায়, কারাগারে যাওয়ার আগে হোমসের জীবনের শেষ কয়েক সপ্তাহের পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্মাতাদের সামনে তখন বড় প্রশ্ন ছিল—একজন দণ্ডিত উদ্যোক্তার নিজের জীবন সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
প্রায় ২ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রের নির্মাণকৌশলও দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ। প্রচলিত তথ্যচিত্রের মতো শুধু সাক্ষাৎকার, পুরোনো সংবাদচিত্র ও ঘটনাক্রমের ওপর নির্ভর না করে এতে বাস্তব জীবন, পর্যবেক্ষণ এবং নির্মাতাদের অভিজ্ঞতার জটিল সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দর্শকেরা একই সঙ্গে একজন বিতর্কিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিসর এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনমতের দিকগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
চলচ্চিত্রটি নির্মাণের কাজ দীর্ঘ সময় গোপনে পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে এর প্রদর্শনী দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সমালোচকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলচ্চিত্রটির পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী ভ্যারাইটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহান্তে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীতে তরুণ দর্শকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ৩৫ বছরের কম বয়সী দর্শকদের অংশগ্রহণ চলচ্চিত্রটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি হলেও দর্শকদের আগ্রহ কমেনি। বরং প্রদর্শনীর সংখ্যা বাড়ার পর আয় বৃদ্ধির ঘটনা প্রমাণ করে, বিষয়বস্তু ও প্রচারের ধরন দর্শক টানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই সাফল্যের পেছনে চলচ্চিত্রটির নির্মাণব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন বিনোদনবিষয়ক প্রতিবেদনে এর নির্মাণব্যয় আনুমানিক ৭০ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে দুই সপ্তাহে প্রায় ৪ কোটি ৫১ লাখ ডলারের আয় নির্মাতাদের জন্য উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রেক্ষাগৃহের মোট আয়কে সরাসরি নিট মুনাফা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ পরিবেশনা, বিপণন, প্রেক্ষাগৃহের অংশ এবং অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত আর্থিক ফলাফল নির্ধারিত হয়।
সপ্তাহান্তের সামগ্রিক আয়তালিকায় চলচ্চিত্রটি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ডিসি স্টুডিওসের ‘ক্লেফেস’ প্রথম সপ্তাহান্তে আনুমানিক ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে শীর্ষস্থান দখল করে। অন্যদিকে হোমসকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে, কারণ দ্বিতীয় সপ্তাহে এর আয় কমার পরিবর্তে বেড়েছে। সাধারণত অনেক চলচ্চিত্র মুক্তির পরবর্তী সপ্তাহে দর্শক হারায়; কিন্তু নতুন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনী সম্প্রসারণের সঙ্গে এই চলচ্চিত্রের আয় বৃদ্ধির ঘটনা ব্যতিক্রমী।
চলচ্চিত্রটির ভবিষ্যৎ পুরস্কার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। সমালোচকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণে এটি অস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মনোনয়ন পেতে পারে বলে বিনোদনজগতের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মনোনয়ন নিশ্চিত হয়নি। তাই এটিকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত, নিশ্চিত অর্জন হিসেবে নয়।
‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’-এর সাফল্য দেখাচ্ছে, দর্শক আকৃষ্ট করতে সব সময় বড় বাজেটের কল্পকাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র প্রয়োজন হয় না। বাস্তব ঘটনা, বিতর্কিত চরিত্র এবং অনুসন্ধানধর্মী উপস্থাপনাও বড় পরিসরে দর্শক টানতে পারে। এলিজাবেথ হোমসের উত্থান ও পতনের গল্প নতুন করে আলোচনায় আসার পাশাপাশি চলচ্চিত্রটি প্রযুক্তিশিল্পে বিশ্বাস, প্রতারণা, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নির্মাণের বিষয়গুলো নিয়েও দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।