মিনেসোটিয়ার অর্থ কেলেঙ্কারিতে ইলহান ওমরকে ঘিরে প্রশ্ন, সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি
মিনেসোটিয়ায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ইলহান ওমরকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র, তবে তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই জরুরি।
মিনেসোটিয়ার অর্থ কেলেঙ্কারিতে ইলহান ওমরকে ঘিরে প্রশ্ন, সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি
৯,৬৪৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে সরকারি সহায়তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, তাঁকে সোমালিয়ায় ফেরত পাঠানোর আগে তাঁর সম্পদ বিক্রি করে মিনেসোটিয়ায় সংঘটিত সোমালি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জালিয়াতির অর্থের কিছু অংশ ফেরত দেওয়া উচিত। একই বক্তব্যে তাঁকে এসব ঘটনা সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে বক্তব্যটি রাজনৈতিক মতামত ও অভিযোগের সমন্বয়; এর প্রতিটি দাবির পক্ষে আলাদা প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
মিনেসোটিয়ায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে বহু আগে। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মহামারির সময় শিশুদের খাবার সরবরাহের জন্য বরাদ্দ অর্থ নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় সরকারি অর্থের অপব্যবহার, ভুয়া খাবার সরবরাহের হিসাব, কাল্পনিক উপকারভোগীর তালিকা এবং মিথ্যা বিল জমা দেওয়ার মতো অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় একাধিক অভিযুক্ত দোষ স্বীকার করেছেন এবং ২০২৫ সালের আগস্টে মামলাসংশ্লিষ্ট দণ্ডিত ব্যক্তির সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যায়। এই কেলেঙ্কারির কারণে অঙ্গরাজ্যটির সরকারি সহায়তা কর্মসূচির তদারকি, অর্থ বিতরণের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি অর্থ যাদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল, তাদের কাছে সেই অর্থ যথাযথভাবে পৌঁছেছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শিশুদের খাবার সরবরাহের অতিরঞ্জিত বা সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসাব দেখিয়ে সরকারি অর্থ দাবি করেছিল। বিচার বিভাগের মামলাগুলোতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আদালতে বিভিন্ন ব্যক্তির অপরাধের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থের অপব্যবহারকে নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো একটি অপরাধের অস্তিত্ব প্রমাণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, একই সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাজনীতিবিদ সেই অপরাধে জড়িত ছিলেন। ইলহান ওমরকে ঘিরে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই। তিনি মিনেসোটার একটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি এবং ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৮ সালে তিনি প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে সোমালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনীতিক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, অভিবাসননীতি নিয়ে বক্তব্য এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সমালোচনার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো সেই বিরোধকে আরও তীব্র করেছে। তবে মিনেসোটিয়ার জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ইলহান ওমরের সম্পর্ক কী, তিনি কোনো অপরাধ সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন কি না, কিংবা তিনি কোনো অবৈধ আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে নির্দিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন। কেবল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, জন্মস্থান কিংবা সোমালীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে তাঁকে অন্য ব্যক্তিদের অপরাধের জন্য দায়ী করা যায় না। এখন পর্যন্ত পর্যালোচিত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ও প্রকাশ্য সরকারি তথ্য থেকে মিনেসোটিয়ার শিশুদের খাবার কর্মসূচির জালিয়াতিতে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটনে ইলহান ওমরের বাসভবনে ফেডারেল কর্মকর্তাদের তল্লাশির খবর প্রকাশিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একটি চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে এই তল্লাশি চালানোর কথা জানায়। তদন্তের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাতে পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর পরিবারের পুরোনো অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে অভিবাসনসংক্রান্ত নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। এই তদন্তের বিষয়টি মিনেসোটিয়ার সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলাগুলোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। একটি তদন্তের বিষয় অভিবাসনসংক্রান্ত নথি, অন্যটি সরকারি সহায়তা কর্মসূচির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে একাধিক অভিযোগ বা তদন্তের খবর প্রকাশিত হলেও প্রতিটি বিষয়ের প্রমাণ ও আইনি পরিণতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। তল্লাশি চালানো মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। একইভাবে তদন্তের আওতায় থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
ওমর এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম তুলে ধরে বলা হয়েছে, তিনি মনে করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশও তদন্তের সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে তাঁর সমালোচকেরা বলছেন, জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর অতীতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। উভয় অবস্থানের ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রমাণ, তদন্তের ফলাফল এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, ওমরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানোর আগে তাঁর সম্পদ বিক্রি করে মিনেসোটিয়ার জালিয়াতির অর্থ ফেরত নেওয়া উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কেবল রাজনৈতিক দাবি যথেষ্ট নয়। সম্পদটি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবৈধভাবে অর্থ অর্জন করেছেন কি না এবং কোন আইনি বিধান প্রয়োগ করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অপরাধলব্ধ অর্থ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ, প্রযোজ্য আইন এবং প্রমাণের গুরুত্ব রয়েছে। অন্য কারও অপরাধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোনো ব্যক্তির সম্পদ নেওয়ার দাবিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনি ভিত্তি তৈরি করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও বহিষ্কারের বিষয়টিও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছেন ২০০০ সালে—এ তথ্য সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নাগরিকত্ব অর্জনের সময় কোনো গুরুতর জালিয়াতি ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তের খবর প্রকাশিত হলেও তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে গেছে বা তাঁকে বহিষ্কার করা হবে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নাগরিকত্ব বাতিলের মতো পদক্ষেপের জন্য প্রযোজ্য আইনগত শর্ত পূরণ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। মিনেসোটিয়ার জালিয়াতির ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযুক্তদের পরিচয় ও সম্প্রদায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচির মামলায় অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তি সোমালীয় বংশোদ্ভূত। কিন্তু অঙ্গরাজ্যটিতে বসবাসকারী সোমালীয় বংশোদ্ভূত সব মানুষকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা তথ্যসম্মত নয়। একইভাবে কোনো সম্প্রদায়ের একজন বা একাধিক ব্যক্তির অপরাধের ভিত্তিতে সেই সম্প্রদায়ের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অপরাধী বলে ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অঙ্গরাজ্যটির সরকারি সহায়তা কর্মসূচির তদারকি নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থ কোথায় গেছে, কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে, জালিয়াতি শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তি এবং অপরাধলব্ধ অর্থ পুনরুদ্ধার করা জনস্বার্থের বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষোভের কারণে প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অপরাধের দায় চাপানো হলে প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহির প্রশ্নটিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ইলহান ওমরকে ঘিরে বিতর্কের পরবর্তী পর্যায় নির্ভর করবে চলমান তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে তার ওপর। মিনেসোটিয়ার সরকারি অর্থ আত্মসাতের মামলাগুলোতে বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে, আর তাঁর অভিবাসনসংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্তের ফলাফলও পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ আনা হলে সেটির ভিত্তি, প্রমাণ এবং আইনি অবস্থা যাচাই করা জরুরি। একইভাবে তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিকে বাস্তব আইনি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করার আগে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ বা সরকারি সিদ্ধান্ত আছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।