সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের তিনটি ঐতিহ্যবাহী ডেগ ও পাঁচটি দানবাক্স থেকে পঞ্চম দফায় গণনা করে নগদ ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পাওয়া গেছে স্বর্ণ, রুপা এবং ১৮টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা। গত ২৪ অক্টোবর শনিবার সকাল থেকে দিনভর প্রকাশ্যে গণনা শেষে সন্ধ্যায় এসব তথ্য জানান সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই গণনা করা হয়। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, মাজার ব্যবস্থাপনায় গঠিত কমিটির প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গণনা শুরু হয়। মাজারের দানবাক্স ও ডেগে জমা হওয়া অর্থ গণনার কাজে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। দিনভর গণনা শেষে পাওয়া অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মাজারের দানের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার ধারাবাহিকতায় পঞ্চমবারের মতো এই কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। এবারের গণনায় নগদ অর্থের পাশাপাশি ১ ভরি সাড়ে ৮ আনা স্বর্ণ এবং ৩ ভরি ১৩ আনা রুপা পাওয়া গেছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এ ছাড়া ১৮টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া গেছে। এসব মুদ্রার মধ্যে ভারতীয় রুপি, ব্রিটিশ পাউন্ড, মার্কিন ডলার, সৌদি রিয়াল, কাতারি রিয়াল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম, মালয়েশীয় রিঙ্গিত, থাই বাত, ওমানি মুদ্রা, ইউরো, নেপালি রুপি, পাকিস্তানি রুপি, শ্রীলঙ্কান রুপি, রুশ রুবল, হংকং ডলার, ব্রুনাই ডলার, মালদ্বীপের মুদ্রা ও বাহরাইনের মুদ্রা রয়েছে। দানবাক্স ও ডেগের মধ্যে পাওয়া বিদেশি মুদ্রার পরিমাণ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় রুপির হিসাব নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সব মুদ্রার পৃথক পরিমাণকে চূড়ান্ত সরকারি তালিকা হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে নগদ বাংলাদেশি টাকা, স্বর্ণ, রুপা এবং ১৮ দেশের মুদ্রা পাওয়ার বিষয়টি একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এবারের গণনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেট সার্কিট হাউসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় মাজারের দানের অর্থ গণনা, সংরক্ষণ এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত হিসাব রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দানের অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজে ব্যয় করার জন্য ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশ মাজারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, আপাতত প্রতি মাসে একবার করে দানের টাকা গণনা করা হবে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রতিদিন গণনার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একজন ব্যবস্থাপক, একজন হিসাবরক্ষক এবং একজন অফিস সহকারী নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলে দানের অর্থ গণনা, হিসাব সংরক্ষণ এবং ব্যয়ের তথ্য নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দানের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে এবং সেখান থেকে অনুমোদিত খাতে ব্যয় করা হবে। বিদ্যুৎ বিলসহ প্রয়োজনীয় পরিষেবা বিল এবং নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন পরিশোধের কথাও জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে এসেছে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আয় ও ব্যয়ের নিয়মিত হিসাব, ব্যাংকে জমার প্রমাণ এবং অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তার তথ্য সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিদেশ থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে দান করেন। কেউ নগদ অর্থ দেন, কেউ স্বর্ণালংকার বা বৈদেশিক মুদ্রা দান করেন। দানবাক্সে পাওয়া চিঠি ও আবেদন থেকেও বোঝা যায়, অনেকে তাঁদের ব্যক্তিগত প্রার্থনা, প্রত্যাশা কিংবা বিভিন্ন দাবি লিখিতভাবে রেখে যান। এবারের গণনাতেও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও আবেদনসংবলিত চিঠি পাওয়া গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
মাজারের দানবাক্সের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার উদ্যোগ শুরু হয় চলতি বছরের জুন মাসে। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে দানের অর্থ গণনা ও ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নিয়ে জনপরিসরে বিস্তারিত তথ্য সহজে পাওয়া যেত না। আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে ১৮ জুন মাজার প্রাঙ্গণে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে আগে থেকে ব্যবহৃত তিনটি ঐতিহাসিক দানের ডেগ এবং দানবাক্স সিলগালা করা হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়। এর মধ্যে ২১ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন ২২ জুন সিলগালা করা ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হয়। সেই প্রথম দফার গণনায় পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক যুক্ত করার পর মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: দানবাক্সে পাওয়া নগদ অর্থ এবং পরে যুক্ত হওয়া চেকের অর্থ এক নয়; দুই অঙ্ক একসঙ্গে হিসাব করলে বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
প্রথম দফার পর দ্বিতীয়বার অর্থ গণনা করা হয় ১১ জুলাই। ওই দফায় ১৯ দিনে দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। তৃতীয় দফায় ১৫ আগস্ট গণনা করে পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দফায় পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। প্রতিবারই নগদ অর্থের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রা ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। পঞ্চম দফায় পাওয়া ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা আগের দফার তুলনায় কিছুটা কম। তবে শুধু নগদ অর্থের পরিমাণ দিয়ে দানের প্রবাহ বা মাজারের আর্থিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কত দিন ধরে দান জমা হয়েছে, কতজন দর্শনার্থী এসেছেন, কী পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া গেছে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। আগের চার দফা এবং সর্বশেষ পঞ্চম দফায় পাওয়া নগদ অর্থের অঙ্ক যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৩ কোটি ১৩ লাখ ২৩ হাজার ১৪৪ টাকা। এই মোটের হিসাব করা হয়েছে পাঁচ দফার মূল নগদ অর্থের অঙ্ক যোগ করে; প্রথম দফায় পরে যুক্ত হওয়া পাঁচ লাখ টাকার চেক এতে আলাদাভাবে যোগ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রথম দফার মোট অর্থের হিসাব এবং পাঁচ দফার নগদ অর্থের সম্মিলিত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে কার্যকর করতে শুধু প্রকাশ্যে টাকা গণনা করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ব্যাংক জমা, দৈনিক আয়-ব্যয়ের নথি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের জবাবদিহি এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। দানের অর্থের কত অংশ উন্নয়নকাজে ব্যয় হলো, কত অংশ দৈনন্দিন পরিচালনায় গেল এবং কোন কোন প্রকল্পে অর্থ ব্যবহার করা হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে ভক্ত ও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হতে পারে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাসে একবার গণনার অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা থেকে প্রতিদিনের গণনা ও হিসাব সংরক্ষণের পরিকল্পনায় কত দ্রুত যাওয়া সম্ভব হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবে চালু হলে দানের অর্থের হিসাব রাখা, ব্যাংকে জমা নিশ্চিত করা এবং ব্যয়ের তথ্য যাচাই করা সহজ হওয়ার কথা। তবে সেই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত বাস্তবায়ন, যথাযথ নথিপত্র এবং জনসাধারণের কাছে তথ্য প্রকাশের ওপর।