পশ্চিম তীরে মার্কিন সাংবাদিককে মারধর, ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা দিলেন রুবিও
৭ মিনিটে পড়ুন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষক, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে একের পর এক হামলার অভিযোগের মধ্যে একজন মার্কিন সাংবাদিকের ওপর সহিংসতার ঘটনা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কেও নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই ঘটনার তদন্ত, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ১৭ অক্টোবর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, হামলার দৃশ্য এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি দেখে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, এ ধরনের সহিংসতা বন্ধে ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে এবং ওয়াশিংটন একই দাবি অব্যাহত রাখবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই থেমে থাকতে চায় না; বরং হামলা প্রতিরোধে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছে।
রুবিওর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে হামলার শিকার ব্যক্তি একজন মার্কিন নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কর্মরত আলোকচিত্রী হওয়ায় ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। তবে রুবিওর বক্তব্যকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা বা আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর মূল বার্তা ছিল সহিংসতা দমন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান। হেইডি লেভিন দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংবাদ ও ছবি সংগ্রহের কাজ করছেন। তিনি মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন। ১৬ অক্টোবর পশ্চিম তীরের আবু ফালাহ গ্রামে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহের পরিস্থিতি ধারণ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং ঘটনাস্থলে ধারণ করা ভিডিওর ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুখ ঢাকা কালো পোশাক পরা কয়েক ডজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ওই এলাকায় হামলা চালায়। তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৮০ ছিল বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি কৃষকদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ এবং জলপাইবাগানে আগুন দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় এবং তাঁদের ব্যক্তিগত ভূমিকা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। লেভিনের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাঁকে মাটিতে ফেলে মারধর করে। তিনি তখন সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবর্ম ও মাথার হেলমেট পরেছিলেন। কিন্তু এসব সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি গুরুতর আঘাত পান। হামলাকারীরা তাঁর ক্যামেরা, মুঠোফোন এবং অন্যান্য সরঞ্জামও ছিনিয়ে নেয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁর আঘাতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়, শরীরে বিভিন্ন স্থানে ক্ষত তৈরি হয় এবং হাতের গুরুতর আঘাতের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, ঘটনাটি শুধু ধাক্কাধাক্কি বা সামান্য সংঘর্ষ ছিল না; বরং তাঁর ওপর শারীরিকভাবে গুরুতর হামলা চালানো হয়েছিল।
লেভিনের ওপর হামলার ঘটনাটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকেরা প্রায়ই গোলাগুলি, বিস্ফোরণ, শারীরিক হামলা এবং সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সাংবাদিকের পরিচয় স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে আক্রমণ করা হলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহের অধিকারের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনায় লেভিন সংবাদমাধ্যমের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর পরনের সুরক্ষাবর্মে সংবাদমাধ্যমের পরিচয়ও স্পষ্ট ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হামলার সময় তাঁর পরিচয় হামলাকারীদের কাছে দৃশ্যমান ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘটনাস্থলের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং চিকিৎসার নথি তদন্তে সহায়ক হতে পারে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছে। রুবিও জানান, জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কাছ থেকে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কনস্যুলার সহায়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই সময়ে পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহকারী ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে। জলপাই ফিলিস্তিনের বহু পরিবারের জন্য শুধু কৃষিপণ্য নয়; এটি তাঁদের আয়, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং জমির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অংশ। প্রতিবছর শরৎকালে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে কৃষকেরা তাঁদের বাগানে গিয়ে ফল সংগ্রহ করেন। কিন্তু নিরাপত্তার অভাব, জমিতে প্রবেশের বাধা এবং সহিংসতার আশঙ্কা তাঁদের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। আবু ফালাহ গ্রামের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কারণও কম। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন-এর তথ্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে অন্তত ১৭০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে; এটি সব ঘটনার স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত সরকারি হিসাব নয়। তবু পরিসংখ্যানটি সহিংসতার ব্যাপকতা সম্পর্কে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে সহিংসতার প্রভাব কৃষকদের তাৎক্ষণিক শারীরিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাগানে আগুন লাগানো, গাছ নষ্ট করা, ফল সংগ্রহে বাধা দেওয়া কিংবা কৃষকদের জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ থাকলে তার অর্থনৈতিক প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। একটি পরিবার যদি মৌসুমের ফসল সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে তাদের বার্ষিক আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরবর্তী বছরের কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে পশ্চিম তীরে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি জীবিকা, সম্পত্তির অধিকার এবং মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। হামলার অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা, কৃষকদের নিরাপদে জমিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এদিকে ১৭ অক্টোবর পশ্চিম তীরের তাইবেহ গ্রামে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি দলের ওপরও হামলার খবর প্রকাশিত হয়। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই দলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের প্রতিনিধিরা ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা ফরাসি এক মেয়রও হামলার শিকার হন বলে খবর পাওয়া যায়। এই ঘটনা লেভিনের ওপর হামলার পরদিন ঘটে এবং পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ায়। তবে দুটি ঘটনা একই স্থানে বা একই হামলার অংশ ছিল—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন। তদন্ত শুরু হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করাই হবে কার্যকর পদক্ষেপের মূল পরীক্ষা। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ অবৈধ বলে বিবেচনা করে। ইসরায়েল এই আইনি অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। এই বৃহত্তর বিরোধের মধ্যেই ফিলিস্তিনি কৃষকদের জমি, চলাচল এবং নিরাপত্তা নিয়ে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিরোধ যাই থাকুক, বেসামরিক মানুষ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগকে আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবিক নীতি ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত। সংবাদকর্মীরা সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত করে সাধারণ মানুষের সামনে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তাঁদের ওপর হামলা হলে শুধু একজন ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; জনসাধারণের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রুবিওর বক্তব্য থেকে এখনই বলা যায় না যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। তবে তাঁর প্রকাশ্য উদ্বেগ এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান দেখায়, ওয়াশিংটন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই বক্তব্যের বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তদন্ত কতটা স্বচ্ছ হয় এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, তার ওপর।
সব মিলিয়ে, হেইডি লেভিনের ওপর হামলা পশ্চিম তীরে সাংবাদিক ও ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিরাপত্তাসংকটকে আবারও সামনে এনেছে। একই মৌসুমে কৃষকদের ওপর হামলার ধারাবাহিক অভিযোগ এবং ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের ওপর হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে তদন্তের অগ্রগতি, আহতদের সুস্থতা, কৃষকদের নিরাপদে ফসল সংগ্রহের সুযোগ এবং হামলাকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকে। শুধু নিন্দা বা উদ্বেগ প্রকাশ নয়, সহিংসতা বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই ঘটনায় দায়বদ্ধতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়।